ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদ্ভিদ

শরৎ সেজেছে চন্দন পুষ্পে

শরৎ সেজেছে চন্দন পুষ্পে
×

বলধা উদ্যানে শরতে ফুটেছে চন্দন ফুল লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৭ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ১১:৩৩

চন্দনের সঙ্গে পরিচয় সেই শিশুকাল থেকেই। মা-ঠাকুমা শুকনো চন্দন কাঠ পাটায় বেটে পূজার সময় ফোঁটা দিতেন। মাথাব্যথা হলে দেখতাম, ঠাকুমা চন্দন বাটার সঙ্গে কর্পূর মিশিয়ে কপালে লাগিয়ে দিতেন। তাতে উপশম হতো। শ্বেতচন্দন ও রক্তচন্দন– তখন এ দুই রকমের চন্দনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল। কিন্তু কখনও সেই গাছ দেখা হয়নি। এ দেশে কি চন্দন গাছ আছে? ‘ঢাকা শহরের বৃক্ষ’ বইটি লিখতে গিয়ে চন্দন গাছের সন্ধানে নামলাম। ড. নওয়াজেশ আহমদের কাছে একদিন শুনেছিলাম, ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে চন্দন গাছ আছে। সে কথা মনে করে উদ্ভিদ উদ্যানের সাবেক বোটানিস্ট শামসুল হক ভাইকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন– ছিল, তবে চুরি হয়ে গেছে।

পরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের মালী আলীম ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি বললেন, ‘একটা চন্দন গাছ আছে, নার্সারির ভেতরে থাকায় সেটি এখনও টিকে আছে।’ দেরি না করে ছুটলাম সেখানে। গিয়ে বেশ হতাশ হলাম। আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী সে গাছটিকে শতবর্ষী বুড়োর মতো দেখাচ্ছে। মোটা একটি লতানো গাছ তার গা বেয়ে উঠে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে। আসন্ন মৃত্যুর শঙ্কায় যেন দিন গুনছে। জানা গেল, এ আশঙ্কার কারণেই কর্তৃপক্ষ নতুন করে কিছু শ্বেতচন্দনের চারা লাগিয়েছে। ক্ষতির আশঙ্কায় তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পরে অবশ্য একদিন বলধা উদ্যানে গিয়ে সাইকী অংশের ভেতর একটা শ্বেতচন্দনের গাছ দেখলাম। ডালপালা ও পাতা নিয়ে গাছটা বেশ ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে শরতের শুরুতেই আবার সেখানে গিয়ে দেখা হলো গাছটার সঙ্গে। ফুলে ফুলে ভরা। এই প্রথম চন্দনফুলের দেখা পেলাম। শুনেছি, টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি রক্তচন্দনের গাছও আছে।

পনেরো শতকে রচিত রাজনিঘুণ্টি গ্রন্থে ছয় রকমের চন্দনের নাম পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে শ্বেতচন্দন, রক্তচন্দন, কুচন্দন (এ দেশে রক্তকম্বল বা রঞ্জনা নামে পরিচিত), পীতচন্দন উল্লেখযোগ্য। চন্দন গাছ বেশি রয়েছে ভারতের কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ইত্যাদি স্থানে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৎকালীন সিভিল সার্জন জেমস টেলর ১৮৪০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ গ্রন্থে ঢাকায় রক্তচন্দন গাছ আছে বলে উল্লেখ করলেও আসলে তিনি রঞ্জনা (অ্যাডিনানথেরা প্যাভোনিয়া) গাছকেই রক্তচন্দন মনে করেছিলেন। সেই সূত্রে আজও আমরা একই ভুল করে চলেছি।

ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন শ্বেতচন্দন গাছের আদিনিবাস। ইংরেজি নাম White sandalwood বা Indian sandalwood, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Santalum album ও গোত্র স্যান্টালেসি। শ্বেতচন্দন একটি চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী ছোট বৃক্ষ। গাছ ৪ থেকে ৯ মিটার লম্বা হয়। পাতা পাতলা, কিনারা মসৃণ, অগ্রভাগ সুচালো, চর্মবৎ, ওপরের পিঠ সবুজ ও নিচের পিঠ হালকা সবুজ। ডালে পাতাগুলো বিপরীতমুখীভাবে জন্মে। ফুল খুব ছোট, থোকায় ফোটে, রং মেরুন লাল। পেয়ালা আকৃতির ছোট ফল হয়। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে হয় কালো। সাধারণত চারা লাগানোর তিন থেকে পাঁচ বছর পর ফুল ফোটে। 

বলধা উদ্যানের গাছটির বয়স ১৪-১৫ বছর। মালী হাফিজুর রহমান জানালেন, এবারই তিনি প্রথম ফুল ফুটতে দেখলেন। ভেতরের সুগন্ধযুক্ত সারকাঠ গঠিত হতে ২০ থেকে ৩০ বছর লাগে। এর আগে গাছ কাটলে কোনো লাভ হয় না।

আহা! আমাদের যদি একটা চন্দন বন থাকত, তাহলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো আমরাও হয়তো পেতাম কারও ভ্রুকুটি পল্লবের ডাক, সেই চন্দন বনের শীতল ছায়ায় পেতাম কারও কোনো উষ্ণ সান্নিধ্য, শুনতে পেতাম ‘দেখা হবে’ কবিতার আহ্বান– ‘ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে–/ সুগন্ধের সঙ্গ পাবো দ্বিপ্রহরে বিজন ছায়ায়/ আহা কী শীতল স্পর্শ হৃদয়-ললাটে, আহা, চন্দন, চন্দন/ দৃষ্টিতে কি শান্তি দিলে, চন্দন, চন্দন/ আমি বসে থাকবো দীর্ঘ নিরালায়!’ এ দেশে শিমুল বন হয়েছে, কদম বন হচ্ছে। বন বিভাগ কি এ দেশে একটি চন্দন বন তৈরি করবে?

আরও পড়ুন

×