ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সমকালের ভার্চুয়াল বিশেষ সংলাপ

প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ চাহিদার মানুষদের জন্য সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরির আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ চাহিদার মানুষদের জন্য সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরির আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
×

বৃহস্পতিবার সমকালের ভার্চুয়াল বিশেষ সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২০ | ১০:২৮ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২০ | ০২:২৩

মহামারির বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার সমকাল আয়োজিত 'প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ :করোনা সংকট মোকাবিলায় আমাদের করণীয়' শীর্ষক সংলাপে তারা এ প্রস্তাব দেন।

ফেসবুক লাইভে অনুষ্ঠিত এ ভার্চুয়াল সংলাপে আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অটিজম ও এনডিডি সেলের প্রধান সমন্বয়কারী ড. এ এম পারভেজ রহিম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার প্রকল্পের কারখানা ব্যবস্থাপক মহসিন আলী, এসিআই লজিস্টিক লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির, পিএফডিএ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাজিদা রহমান ড্যানি এবং প্রেরণা ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির পরিচালক মুবিনা আসাফ। 

সংলাপ সঞ্চালনা করেন সমকালের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যান্ডিং এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ইনচার্জ ইমরান কাদির। এ সময় এই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য তুলে ধরে ইমরান কাদির শুরুতেই জানান, কভিড-১৯ মহামারিজনিত পরিস্থিতিতে পুরো বিশ্বই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এ মুহূর্তে সেই চ্যালেঞ্জ আরও বেশি প্রকট বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষকে স্বাবলম্বী রাখার ক্ষেত্রে।

এ-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান তুলে প্রারম্ভিক বক্তব্যে বলা হয়, সমাজের যে মানুষগুলো নানা প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেঁচে আছেন এবং বিশেষ সক্ষমতার মানুষ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যারা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে ভুগছেন, করোনা সংকটের এ সময়ে তারা কেমন আছেন, তা জানতে এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য কী করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে তাদের অধিকার, ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যারা ইতোমধ্যেই কাজ করছেন তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরার জন্যই এই সংলাপ।

প্রারম্ভিক বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯.০৭ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা আছে। সংখ্যার দিক দিয়ে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে একটা বড় অংশ স্নায়ুবিক প্রতিবন্ধকতা বা অটিজমের নানা লক্ষণ নিয়ে বেঁচে আছে। ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারের এক প্রকাশনা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ অটিজমে ভুগছে।

করোনার মহামারি একদিকে বিশ্বের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর জন্য যেমন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, একই সঙ্গে এটি সমাজের বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্যও বয়ে এনেছে নতুন সংকট। এই বিশেষ সক্ষমতার মানুষ একদিকে যেমন বিভিন্ন গঠনমূলক চর্চায় নিজেদের অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখতে পারেন, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাকিদের মতো স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে চলা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষেত্র বিশেষে তারা তাদের মনের ভাব স্পষ্টভাবে জানাতেও অপারগ হয়ে পড়েন।

করোনা মহামারির মতো একটি সংকটময় পরিস্থিতিতে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যেখানে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিবিধ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অটিজমে আক্রান্ত একজন মানুষকে এই ব্যাপারগুলোর গুরুত্ব বোঝানো এবং অনুশীলনের মাধ্যমে এ অভ্যাসগুলোতে অভ্যস্ত করা বেশ শ্রমসাধ্য। তাছাড়া দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই এরকম একটা পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে সক্ষম মানুষেরা সবার কাছ থেকে আলাদা মনোযোগ দাবি করে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অটিজম ও এনডিডি সেলের প্রধান সমন্বয়কারী ড. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, সরকারি জরিপ অনুযায়ী দেশে দুই লাখ ৫২ হাজার প্রতিবন্ধী রয়েছে। কভিড-১৯-এর মধ্যে তাদের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশেষভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা চিকিৎসা শুরু হলে তাদের এখানে আনা হবে। যেহেতু আইন অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়, তাই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তাদের কোনো ক্যাশ পাওয়া যায়নি। এতে বোঝা গেছে, তারা 'স্টে হোম স্টে সেফ' খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। এতে তারা অনেক উপকৃত হয়েছেন।

তিনি বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ী ১২ ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছেন। এর মধ্যে চার ধরনের প্রতিবন্ধীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। দেশের ১৫টি মেডিকেলে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর বাকি আট শ্রেণির প্রতিবন্ধীদের অন্যান্য মেডিকেলে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করছে। প্রতি সোমবার সকাল ১০টায় এই পাঁচটি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে বৈঠক করে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আইন ও বিধিবিধানগুলো যথাযথভাবে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ হয়।

শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট, মৈত্রী শিল্প কারখানার ব্যবস্থাপক মো. মহসিন আলী বলেন, করোনাকালীন সময়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক সচেতনতার সঙ্গে কাজ করছেন। ফলে এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিষ্ঠানে কেউ সমস্যায় পড়েনি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক বড় ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ ফেস করেন। ফলে তারা যে কোনো বিষয় একবার ভালোভাবে দেখলেই শিখতে পারেন। কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক। যে কোনো বিষয় দেখলেই তারা অনুকরণ করতে পারেন। আর যারা বাকপ্রতিবন্ধী তাদের ইশারায় শেখাতে হয়। সরকারি-বেসরকারি ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করলে তাদের দ্রুত আরও দক্ষ করে গড়ে তোলা যাবে।

তিনি বলেন, আমাদের কারখানায় মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার তৈরি করা হয়। ২৫ মার্চ থেকে বন্ধ থাকলেও গত ১৩ এপ্রিল থেকে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে এখানে সীমিত পরিসরে উৎপাদন কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিবন্ধী শ্রমিকরা সচেতন হওয়ায় কারখানায় তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। তবে যাদের বেশি বয়স বা আগে থেকে শারীরিক সমস্যা আছে তারা ছুটিতে আছেন। তিনি বলেন, মুজিব বর্ষে ৩০০ জন প্রতিবন্ধীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির বলেন, শুধু বিশেষ কিছু মানুষকে প্রতিবন্ধী বলা হয়। তাই এই প্রতিবন্ধী শব্দটি নিয়ে আমার আপত্তি আছে। কারণ সমাজে যত মানুষ আছে, তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। হয়তো শারীরিকভাবে, হয়তো মনস্তাত্ত্বিকভাবে। 

তিনি বলেন, স্বপ্ন তাদের কাজে প্রতিবন্ধীদের বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের (পিএফডিএ) ৩৩ জন প্রতিবন্ধীকে তারা কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে ২৩ জন প্রতিবন্ধী দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। বাকি ১০ জন নিজেদের সমস্যার কারণে কাজ করতে পারেনি। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুললে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে।

সাব্বির হাসান নাসির বলেন, স্বপ্ন তাদের প্রতিষ্ঠানে ২০০ প্রতিবন্ধীকে চাকরি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ জন্য প্রতিবন্ধী বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাদের কাছে প্রতিবন্ধীদের সিভি পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি। প্রতিবন্ধীদের চাকরির জন্য প্রয়োজনে তার সঙ্গে সরাসরি যোগযোগ করতেও বলেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকের মধ্যে বিভিন্ন গুণ রয়েছে। এ জন্য তাদের উৎসাহ দিতে হবে। দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে দেশের যে কোনো কাজের জন্য তারা যোগ্য হয়ে উঠবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পিএফডিএ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাজিদা রহমান ড্যানি বলেন, তার প্রতিষ্ঠান মূলত বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করছে। ১১ বছরের পর থেকে তাদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্যও কাজ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি নয়, বরং সমাজে তাদের স্বীকৃতির জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতেও কাজ করতে হবে। এটাও এক ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধি। কভিড-১৯ জনিত এই পরিস্থিতিতে পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল সদস্য হিসেবে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তির ওপরেই এর নেতিবাচক প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশি পড়ছে। কারণ সে অনেক ক্ষেত্রে নিজের সমস্যার কথাটিই বলতে পারছে না। যেমন, এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কভিড-১৯ পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। আবার এই ব্যক্তিদের নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের অর্থায়নের সংকটও তীব্র হয়েছে। এ দুটি সংকট নিরসনে জরুরি মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

প্রেরণা ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির পরিচালক মুবিনা আসাফ বলেন, কভিড-১৯ সংকটে প্রতিবন্ধীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য বেসরকারি সংস্থা পিএফডিএর সঙ্গে মিলে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। যেমন, তাদের মাস্ক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের প্রশিক্ষণকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার জন্য 'আমরা শিখি আমরা পারি' প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিকল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সময়োপযোগী কর্মসংস্থানে নিয়োজিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধীদের জন্য বৃহত্তর পরিসরে কিছু করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেন তিনি।

আরও পড়ুন

×