ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ট্রাইব্যুনালে মাহমুদুর রহমান

শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট হবার পেছনে সহযোগী ছিল সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, মিডিয়া ও রাজনীতিবিদ    

শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট হবার পেছনে সহযোগী ছিল সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, মিডিয়া ও রাজনীতিবিদ    
×

ছবি-সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২১:১৪

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে জঙ্গি দমনসহ মেকি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন তিনি। তার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে সহযোগী ভূমিকা পালন করেছে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, মিডিয়া ও রাজনীতিবিদ।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সাক্ষ্যে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট হওয়ার পেছনে বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও সেনাবাহিনী রয়েছে। বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই। ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছেন শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী। 

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিক, লেখক ও ইতিহাস গবেষক হিসেবে এই ফ্যাসিস্ট শাসনের উত্থান, বিকাশ এবং পতন প্রত্যক্ষ করেছি। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছি। এই ফ্যাসিবাদের সৃষ্টি একটি মেটিকুলাস প্লানিংয়ের মাধ্যমে হয়েছিল। সেই প্ল্যানিংয়ে দেশের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে একটি বিদেশি শক্তি জড়িত ছিল।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের ৪৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এদিন বেলা সোয়া ১১টা থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়ে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত চলে। এরপর এক ঘণ্টার বিরতির পর আবার শুরু হয়ে বিকেল চারটা পর্যন্ত চলে। সেদিন শেষ না হওয়ায় আজ মঙ্গলবার বাকী জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে। এরপর তাকে জেরা করবেন শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। চার ঘণ্টার জবানবন্দিতে ১৫ বছরে আওয়ামী দুঃশাসনের পুরো চিত্র তুলে ধরেন লেখক ও ইতিহাস গবেষক মাহমুদুর রহমান।

আমার দেশ সম্পাদক বলেন, বিচার বিভাগ থেকে ফ্যাসিবাদকে শক্তি যুগিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি নিজামুল হক ও বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল প্রয়াত মাহবুবে আলম, অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক আইন সচিব প্রয়াত জহিরুল হক দুলাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউর প্রয়াত গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর রানা দাস গুপ্ত, প্রসিকিউটর প্রয়াত জেয়াদ আল-মালুম, দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান ও মোশাররফ হোসেন কাজল উল্লেখযোগ্য। 

এছাড়া পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়ালের কাজ করেছেন সাবেক আইজিপি একেএম, শহিদুল হক, বেনজীর আহমেদ, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, জাবেদ পাটোয়ারী ও নুর মোহাম্মদ। আর সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান, হাবিবুর রহমান, ডিবির প্রধান হারুনুর রশীদ, বিপ্লব সরকার, মেহেদী হাসান, প্রলয় কুমার জোয়াদ্দার প্রমুখ। নির্বাচন কমিশনের মধ্যে ২০১৪ সালের রকিব উদ্দিন কমিশন, ২০১৮ সালে নুরুল হুদা কমিশনের মরহুম মাহাবুব তালুকদার ছাড়া অন্যান্য কমিশনার এবং ২০২৪ সালের কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের সদস্যরা নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংসের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে দীর্ঘস্থায়ী করেছেন। 

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের সহযোগী ভূমিকা পালন করেছেন জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের। ১৪ দলীয় নেতাদের মধ্যে হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, দিলীপ বড়ুয়া, নজিবুল বাশার মাইজভান্ডারি, ফজলে হোসেন বাদশা, শিরিন আক্তার ও তাদের সঙ্গীরাও ফ্যাসিবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। ১৪ দলের বাইরে মেজর জেনারেল (অব.) ইব্রাহিম, শমশের মুবিন চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, মিজবাউর রহমান চৌধুরী, আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, মাহি বি চৌধুরীরাও ফ্যাসিবাদকে দীর্ঘায়িত করেছেন। এছাড়া সেনাবাহিনীর মধ্যে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে ২০০৮ সালে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা জেনারেল আমিন, ব্রিগেডিয়ার বারী ও ব্রিগেডিয়ার মামুন খালেদ ভূমিকা রেখেছেন।

তিনি বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভুয়া নির্বাচনকালীন ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় নিজেদের নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না সাবেক তিন সেনাপ্রধান তথা জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, জেনারেল আজিজ আহমেদ ও জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ। ডিজিএফআইয়ের অধিকাংশ ডিজি এই সময়ের মধ্যে সরকারের জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এরমধ্যে গুমসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোল্লা ফজলে আকবর, লে. জেনারেল মামুন খালেদ, লে. জেনারেল আকবর হোসেন, জেনারেল সাইফুল আমিন, তাবরেজ শামস, হামিদুল হক। তবে র‍্যাবের সেনা সদস্যদের মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান সবচেয়ে বিতর্কিত। তিনি জুলুমকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের বাইরে থেকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল ভারতের।

আলোচিত স্কাইপ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে জবানবন্দিতে মাহমুদুর রহমান বলেন, মতিঝিল শাপলা চত্বরে গণহত্যার কিছুদিন আগে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার চলছিল। ট্রাইব্যুনালের তখন চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম। তিনি বিচারের নামে যে অবিচার করেছিলেন তার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল আমার দেশ ও লন্ডনের দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকা। নিজের বেঞ্চের মামলা নিয়ে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক জিয়া উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন বিচারপতি নিজামুল হক। সেই কথোপকথনে দেখা যায়, একটি তামাশায় পরিণত হয়েছিল পুরো বিচারপ্রক্রিয়া। সাক্ষীর জেরার প্রশ্নোত্তর থেকে শুরু করে খসড়া রায় লিখে দেওয়া পর্যন্ত বিচারপতি নিজামুল, বিদেশে থাকা জিয়া উদ্দিন ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল-মালুম নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে আগে থেকেই নির্ধারণ করেন। এর একটি উদাহরণ হলো, জেয়াদ আল-মালুমকে আগে থেকেই বিচারপতি নিজামুল বলতেন-বিচার চলাকালে তিনি যেন মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানান। পরে তাকে বসিয়ে দেবেন বিচারপতি নিজামুল। ভাষাটা এমন ছিল- ‘আপনি দাঁড়াইয়া যাবেন আর আমি বসাইয়া দিমু। সবাই মনে করবে আমাদের খাতির নেই।’

মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশে একটি ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করতে হলে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা আবশ্যক। কারণ দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মোরাল যদি উচ্চ থাকে তাহলে তারা কোনো অবস্থাতেই একটি বিদেশি শক্তির ইঙ্গিতে দেশে কোনো পুতুল সরকারকে মেনে নিবে না। সুতরাং পরিকল্পনা মতো শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে বিডিআর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পুরো কাজটি করা হয়েছিল আদালতকে ব্যবহার করে। আর দ্বিতীয়টি হলো-তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা।

জবানবন্দির একপর্যায়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে তিন তিনটি নির্বাচনী তামাশা মঞ্চস্থ হয়। প্রথমটি ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে, দ্বিতীয়টি ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এবং তৃতীয়টি ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। ২০১৪ সালে সম্পূর্ণ একটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে কোনোরকম ভোট প্রদানের আগেই ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।

আরও দু’একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হবে: চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আরো দু-একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হবে।’ আজ ৪৬তম সাক্ষী হিসেবে মাহমুদুর রহমানের সাক্ষ্য নেওয়ার পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান চিফ প্রসিকিউটর। 

তিনি বলেন, ‘আরো দু-একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর আমরা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য শেষের আবেদন করব। এরপর এই মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হবে বলে আশা করি।’ 

তাজুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা আছে। তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে এবং আমাদের একজন ফরমাল সাক্ষী আছেন, তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আশা করছি এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হবে।

আরও পড়ুন

×