ন্যায্য দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা
পাট নিয়ে কৃষক যাবেন কোথায়
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২০ | ১৫:৩৪
এ মাসের শুরুতে সরকারি সব পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি পাটকল আর পাট কিনবে না; বরং এসব মিলের হাতে থাকা মজুদ পাট বিক্রি করতে হবে। তাহলে কৃষক পাট বেচবেন কোথায়? বেসরকারি পাটকলগুলো কতটুকু কিনবে? পাটের ন্যায্য দাম কি পাওয়া যাবে? সারাদেশের পাটচাষিদের এমন প্রশ্ন আর উদ্বেগের মধ্যে ভিন্ন এক বাস্তবতায় ক্ষেত থেকে পাট উঠতে শুরু করেছে।
পাটের পরিমাপ করা হয় সাধারণত বেল আকারে। ১৫০ কেজিতে এক বেল গণনা করা হয়। সরকার প্রতি বছর গড়ে ১৩ লাখ বেল পাট কিনে থাকে। আগামী সপ্তাহে হাটে নতুন পাট উঠতে শুরু করবে। গত বছর গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকা মণপ্রতি দর পেয়েছেন কৃষক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য হলো, গত বছর দেশে ৬৮ লাখ বেল পাট উৎপন্ন হয়েছে। চলতি মৌসুমে ৮২ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। মোট ৭ দশমিক ২৬ হেক্টর জমিতে এবার পাটের আবাদ হয়েছে। গত সোমবার পর্যন্ত ১৮ শতাংশ পাট কাটা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হাটে পুরোপুরি পাট উঠতে শুরু করবে।
কৃষি তথ্যসেবা সূত্রে জানা গেছে, ৪০ লাখ চাষি পাট চাষ করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি মানুষের জীবিকা পাটকে কেন্দ্র করে। প্রতি বছর মৌসুমে গড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পান কৃষক। দেশের প্রায় সব জেলাতেই পাট উৎপন্ন হয়। তবে বেশি উৎপন্ন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলায়। এসব জেলার পাটচাষিদের মধ্যে পাট বিক্রি এবং ন্যায্য দর পাওয়া নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হয় ফরিদপুর ও টাঙ্গাইল জেলায়। এই দুই জেলার অন্তত ১০ জন চাষির সঙ্গে কথা বলে তাদের হতাশার কথা জানা গেছে।
টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামের আব্দুল মজিদ জানান, সরকার এবার পাট কিনবে না শুনেই তার রাতের ঘুম হারাম। পাট চাষের আয়েই ছয়জনের সংসারে সারা বছরের ব্যয় চলে তার। জাগ থেকে পাট উঠতে শুরু হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হাটে নেওয়ার কথা। তিনি জানান, ধারদেনা করে ৪২ হাজার টাকা খরচ করে সাত বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। এখন ন্যায্য দর না পেলে ঋণ পরিশোধ করবেন কীভাবে, আর সংসারই বা চলবে কীভাবে। দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠান গ্রামের সুজায়েত হোসেন বলেন, বেসরকারি উদ্যোক্তারা গতবারের তুলনায় এবার বেশি করে পাট না কিনলে দাম পড়ে যাবে। কাকুয়া ইউনিয়নের গোতবাড়ি গ্রামের আমিরুল ইসলাম, আব্দুল ওয়াহেদ, মজিদ ব্যাপারী সবারই একই চিন্তা।
ফরিদপুর অঞ্চলে কৃষকরা পাট কাটতে শুরু করেছেন আরও আগেই। ইতোমধ্যে হাটেও নিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বিভাগদী গ্রামের চাষি আলতাফ শেখ সমকালকে জানান, এবার সরকারি পাটকল বন্ধ থাকায় বাজারে পাটের দাম কম। বাজারে পাটের ন্যায্য দাম না পেলে তাদের অনেক ক্ষতি হবে। করোনার কারণে পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানোর জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য উৎপাদনের খরচও বেশি হচ্ছে অন্য বছরের তুলনায়। এর মধ্যে দর কম হলে তারা কীভাবে বাঁচবেন। ভাওয়াল ইউনিয়নের পুরুরা গ্রামের শান্তি সরকার জানান, প্রতিবিঘা পাট উৎপাদনে বীজ, সার, ওষুধ, সেচ, পাট কাটা ও পাটের আঁশ ছাড়ানো দিয়ে মোট ব্যয় আছে ২০ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি পাট উৎপাদন ৯ থেকে ১০ মণ। পাটের দরের সঙ্গে হিসাব করলে খুব বেশি লাভ হয় না। তার ওপর যদি সরকার পাট না কিনে তাহলে কষ্টের সীমা থাকবে না। গট্টি ইউনিয়নের জয়ঝাপ গ্রামের হাতেম মোল্লা ও শিহিপুর গ্রামের লিয়াকত মোল্লা জানান, বাজারে পাটের চাহিদা কম। দুই হাজার টাকার বেশি দর পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর দুই হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত মণপ্রতি দর পেয়েছেন তারা। প্রতি মণ পাটের মূল্য কমপক্ষে তিন হাজার টাকা হলে তারা লাভবান হতেন।
সরকারি পাটকলে পাট আসত অনুমোদিত ৪৮ এজেন্সির মাধ্যমে। এমন এক এজেন্সি সোনার বাংলা ট্রেডার্স। এর স্বত্বাধিকারী এনামুল হক হীরক সমকালকে বলেন, সরকারি পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে বেসরকারি কলগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করবে। তারা ইচ্ছামতো পাটের দর নির্ধারণ করবে। ফলে কৃষক ন্যায্য দর থেকে বঞ্চিত হবেন। গত কোরবানির ঈদে চামড়া নিয়ে যে রকম অরাজক পরিস্থিতি হয়েছিল এবার পাট নিয়েও সেই একই অবস্থা তৈরি হবে। আস্তে আস্তে পাটচাষে আগ্রহ হারাবেন চাষি। এতে অর্থনীতি অর্থাৎ দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ সমকালকে বলেন, এবার পাট কিনবে না সরকার। এই বাবদ বরাদ্দও রাখা হয়নি; বরং হাতে মজুদ পাট বিক্রি করতে হবে। বন্ধ মিলগুলোতে কী পরিমাণ পাট মজুদ আছে, এখন সেই হিসাব করছেন তারা। তাহলে কৃষক পাট নিয়ে যাবেন কোথায় জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান বলেন, কৃষক যাতে ন্যায্য দর থেকে বঞ্চিত না হন, সে ব্যাপারে সতর্ক আছে সরকার। সরকার পাট না কিনলেও অনেক পথ রয়েছে পাট বিক্রি ও রপ্তানির। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন তারা। তবে খুব প্রয়োজন মনে করলে সরকার কিনতেও পারে। সরকারি পাটকলগুলোর গুদাম খালি পড়ে আছে। সেখানে পাট রাখা যাবে। আবার সময়মতো ক্রয় মূল্যে বিক্রি করা যাবে। প্রয়োজনে কিছু ভর্তুকি দিয়েই বিক্রি করা যাবে।
তবে এবার পাট বিক্রি নিয়ে কৃষকের সমস্যা খুব সহজেই সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে করেন না সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজ। সমকালকে তিনি বলেন, যত কিছুই হোক, এ বছর পাট নিয়ে কৃষকের সমস্যা হবেই। কারণ, বেসরকারি খাতে কাঁচাপাট রপ্তানি বাড়ানোর যে সুযোগ আছে, তা কাজে লাগাতে আগে থেকেই প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। হঠাৎ করেই রপ্তানি বা বিক্রি সম্ভব হবে না। তবে এখন থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সেই প্রক্রিয়া শুরু করলে আগামী বছর থেকে কাঁচাপাট রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে।
কাঁচাপাট রপ্তানির সুযোগ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার পাট না কেনার প্রেক্ষাপটে কাঁচাপাট রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা এ বছর অন্যবারের তুলনায় বেশি রপ্তানির চেষ্টা করবেন। তবে চাইলেই রপ্তানি করা সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান বলছে, কাঁচাপাট রপ্তানির পরিমাণ কমছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হতো। বছর বছর কমে এখন তা ৮ থেকে ৯ লাখ বেলে নেমে এসেছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ বেল। সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আরও কমে তা ৬ লাখ ১৪ হাজার বেলে নেমে এসেছে। জানতে চাইলে কাঁচাপাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) সভাপতি এস কে সৈয়দ আলী সমকালকে বলেন, বন্যায় কিছুটা ক্ষতি হলেও পাটের আবাদ এবার ভালো হয়েছে। সরকার তো এ বছর পাট কিনবে না। এ কারণে এবার রপ্তানি বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন তারা।
সরকারি ও বেসরকারি সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদিত পাটের ৫০ থেকে ৫৫ লাখ বেল ব্যবহার হয় বেসরকারি খাতের পাটকলগুলোতে। স্থানীয় বাজার থেকে ফড়িয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সারা বছরের পাট সংগ্রহ করে বেসরকারি খাতের মিলগুলো। তবে সরকারি পাটকলের মতো বড় আকারের গুদাম না থাকায় মৌসুমে প্রয়োজনীয় পাট কেনা সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে। গুদাম আছে এমন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাট কেনেন তারা। এবার পরিমাণে বেশি কিনবেন কিনা জানতে চাইলে বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বিজেএমএর সভাপতি মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারি সমকালকে বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তারা হয়তো এ বছর বেশি পাট কিনতে পারবেন না। তবে এত দিন অভ্যন্তরীণ এবং রপ্তানি বাজারে সরকারি খাতে যতটুকু অংশ ছিল সেটা পর্যায়ক্রমে পূরণ করার চেষ্টা করবেন তারা।
- বিষয় :
- ন্যায্য দাম
- চাষিরা
- চাষি
- পাট
- কৃষক
