পুষ্প
রমনা উদ্যানের বাওবাব ফুল
রমনা উদ্যানে ফোটা বাওবাব ফুল- লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:১৫
আশ্বিনের ৫ তারিখ। এ বছর শরতের প্রথম আভাস পেলাম ভোর ৬টায় রমনা উদ্যানের ভেতর। হালকা কুয়াশায় ধূসর হয়েছে ঝিলের ওপরটা। ছায়াচ্ছন্ন গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়েছে পাতলা কুয়াশার ওড়না। ফিনফিনে সাদা কুয়াশার পটভূমিতে স্বল্পালোকে গাছগুলোর কালো কালো দেহকে অপূর্ব লাগছে। রোদ নেই। আবার কয়েক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ল আকাশ থেকে। এ বছরের আবহাওয়াটাই যেন কেমন। বর্ষাকাল শুরু হয়েছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে আগেই, আবার সহজে তা যাচ্ছেও না।
গতকাল নারায়ণগঞ্জের ভূলতায় যেতে যেতে দেখলাম কাশফুলের স্ফুরণ। তবে সেসব ফুলও শুভ্রসাদা নয়, কিছুটা বর্ষাকালের মেঘের মতো ধূসর-সাদা। আকাশটা নীল থাকার কথা থাকলেও আশ্বিনের আকাশটা সে রকম নেই; আকাশে লেপ্টে আছে জলভরা ধূসর মেঘেরা। বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যে শরৎ সাহিত্যে যতটা সরব, বাস্তব প্রকৃতিতে ততটাই নীরব মনে হচ্ছে এ বছর। জলবায়ু বদলাচ্ছে, তাই প্রকৃতিও তার চরিত্র বদলাচ্ছে। তা না হলে রমনা উদ্যানে যে বাওবাব গাছে ফুল ফোটার কথা জুন-জুলাইতে, সেই বাওবাব গাছে কেন এ বছর প্রথম ফুলের দেখা পেলাম সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে?
বেশ কয়েক বছর আগে রমনা উদ্যানের বড় বাওবাব গাছটির গোড়ায় দাঁড়িয়ে নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা গাছটি সম্পর্কে বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আফ্রিকার এই বাওবাব গাছটি আরব বণিকদের সৌজন্যে একসময় শ্রীলঙ্কা ও ভারতে আসে। সেখান থেকে আসে আমাদের দেশে। একসময় ঢাকায় নীলক্ষেতে একটি বাওবাব বৃক্ষ ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন নির্মাণের সময় কাটা পড়ে। বলধা গার্ডেনের গাছটিও ঝড়ে ধরাশায়ী হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মনে পড়ে, সে অবস্থায় বাওবাব গাছসহ দ্বিজেন শর্মার একটা ছবিও তুলেছিলাম। রমনার সেই বাওবাব গাছটিকে কোনোভাবেই আফ্রিকার বাওবাব গাছের সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম না।
ভারত মহাসাগরে পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপদেশ মাদাগাস্কারের নাম শুনলেই বাওবাব গাছ দিয়ে সাজানো একটা দেশের ছবি মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। মোটা মোটা গাছ, হঠাৎ সরু হয়ে থাকা ওপরে স্বল্প কিছু ডালপালা। দেখে মনে হয়, কেউ যেন গাছটাকে মাটি থেকে উপড়ে উল্টো করে রেখেছে। গাছের গোড়াটা যেন পানির ট্যাঙ্ক!
মাদাগাস্কারে ছয় প্রজাতির বাওবাব গাছ আছে। প্রতিটি প্রজাতিরই বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। আমাদের দেশে এগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি প্রজাতির বাওবাব গাছ। দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে এই প্রজাতির নাম উল্লেখ করেছেন Adansonia digitata। এ প্রজাতির ইংরেজি নাম আফ্রিকান বাওবাব। তিনি লিখেছেন, শিমুলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বোম্বাকেসী পরিবারের এই বাওবাব গাছের প্রজাতিগত নামের প্রথম অংশ অ্যাডানসোনিয়া নামটি প্রখ্যাত ফরাসি উদ্ভিদবিদ অ্যাদনের স্মৃতিবহ আর ডিজিটাটা অর্থ করতলাকার। এ গাছের পাতা দেখতে হাতের তালুর মতো।
ভীষণ আজব প্রকৃতির এই বাওবাব গাছ। এ গাছ ৫ থেকে ২৫ মিটার লম্বা হয়। গোড়াটা মোটা হতে হতে ৪৫ ফুট পর্যন্ত ব্যাসের হয়ে যায়। গাছ হাজার বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। আফ্রিকায় এ প্রজাতির একটি প্রাচীন গাছের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ বছর। বয়স্ক গাছের গুঁড়ি বা কাণ্ডের ভেতরে একসময় ফাঁপা হয়ে যায়। তখন সেখানে পানির ট্যাঙ্কির মতো পানি জমে। একটা গাছের ভেতরে ২৫০ গ্যালন পানি থাকাটাও বিচিত্র নয়। বয়স্ক বাওবাব গাছ আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলের মানুষের জলতেষ্টা মেটায় বলে ওরা এ গাছকে বলে জীবনবৃক্ষ। পাতায় শিমুল পাতার মতো পাঁচ থেকে সাতটি পত্রক থাকে।
শীতকালে গাছের সব পাতা ঝরে যায়, মে মাসে নতুন পাতা গজানো শুরু হয়। ডালের ডগায় লম্বা বোঁটায় বড় বড় সাদা রঙের ফুল ফোটে এবং নিচের দিকে ঝুলতে থাকে। ফুল ফোটে রাতের বেলায়। সৌভাগ্য যে ভোর ৬টায় গিয়ে তার পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুলের দেখা পেলাম। দিনেও খানিকটা সময় ফুলের পাপড়ি থাকে। এরপর চালতা ফুলের মতো খসে পড়ে। পাপড়িগুলো ওপরের দিকে ওঠানো বলে এর মাঝখানে কদম ফুলের মতো একটা সুগোল বল দেখা যায়, যেটি আসলে অনেক পুরুষকেশরের সমষ্টি। মাঝখানে একটি স্ত্রীকেশর থাকে শলার মতো। ফল বড় ও শক্ত খোসাযুক্ত; শাঁস টক। শুকনো ফল মাছ-ধরা জালের কিনারায় শোলার মতো ব্যবহৃত হয়। বাকলের আঁশ খুব শক্ত, যা দিয়ে দড়ি বানানো যায়।
আফ্রিকার এই দুর্লভ বাওবাব গাছ রয়েছে রমনা পার্কে। একটা গাছ বড়, অন্যটা ছোট। আর একটা মাঝারি আকারের বাওবাব গাছ রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যান বিভাগের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। আফ্রিকান বাওবাব গাছের জন্মভূমি ইয়েমেন ও ওমান।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ।
- বিষয় :
- ফুল
- রমনা উদ্যান
