দেশে বিভিন্ন কারাগারে পাঁচ বছরে ১৪১০ বন্দির মৃত্যু
ছবি-সংগৃহীত
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৩:২৯
দেশে ৭৪টি কারাগারের মধ্যে ৭০টিতে বন্দি আছে। এই ৭০ কারাগারে আছে হাসপাতাল। এগুলোতে চিকিৎসকের স্থায়ী পদ ১৪৮টি। তবে এই পদে আছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন মানিকগঞ্জ কারা হাসপাতালে, অন্যজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে ৯৯ চিকিৎসক অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেন বাইরে থেকে গিয়ে। চিকিৎসক সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন বন্দিরা। ঘটছে অকাল মৃত্যুর ঘটনা।
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের কারাগারে ১ হাজার ৪১০ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গত ১ জানুয়ারি থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ২৩০ জন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কারাগারে বন্দির মৃত্যুর মূল কারণ সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া। এর দায় রাষ্ট্রের। বন্দিদের সঠিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
গতকাল সোমবারও এক হাজতির মৃত্যু হয়েছে। এদিন চুয়াডাঙ্গায় মিলন হোসেন (৩৮) নামে এক হাজতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মারামারির ঘটনায় গত ৪ সেপ্টেম্বর দামুড়হুদা থানার একটি মামলায় মিলন জেলা কারাগারে যান। রোববার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
হার্ট অ্যাটাকে কারাগারে মৃত্যু বেশি হয়। আত্মহত্যা এবং বন্দির হাতে বন্দি খুনের ঘটনাও ঘটে। কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। চিকিৎসক ছাড়াও বিভিন্ন পদে জনবল কম। রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সংকট।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ ২০০ সিটের হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল ২০০৩ সালে। সরঞ্জামও ক্রয় করা হয়। তবে চিকিৎসক, নার্সসহ জনবলের অভাবে আজও সেটি পুরোপুরি চালু হয়নি। দেশের কারাগারগুলোর জটিল রোগীদের এনে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এটি নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে ২০ সিটে সেবা কার্যক্রম চলে। চিকিৎসকের ছয়টি পদ থাকলেও সব শূন্য। সিভিল সার্জনের অফিস থেকে দুজন অস্থায়ী হিসেবে সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ডিপ্লোমা নার্সের পদ চারটি। তবে আছেন একজন।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ১০ বেডের হাসপাতালে স্থায়ী চিকিৎসকের দুটি পদ থাকলেও এগুলো শূন্য। সিভিল সার্জন অফিস থেকে দুজন চিকিৎসক অস্থায়ী হিসেবে কাজ করেন। তারা সকালে আসেন বিকেলে চলে যান।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, স্থায়ী পদে চিকিৎসক না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হয়। রাতে বন্দি হঠাৎ অসুস্থ হলে চিকিৎসক পাওয়া যায় না। ফোনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়। বন্দির অবস্থা গুরুতর হলে বাইরের হাসপাতালে নিতে হয়। তিনি আরও বলেন, যে দুজন চিকৎসক অস্থায়ীভাবে আসেন, তারা মূলত আউটডোর সেবা দেন। ইনডোর সেবা পাওয়া যায় না।
কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হাসপাতালে বেড ১৭৪টি। চিকিৎসকের সাতটি পদ থাকলেও সবই শূন্য। প্রেষণে দুজন চিকিৎসক রয়েছেন। ডিপ্লোমা নার্স নেই। ফার্মাসিস্ট আছেন একজন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুরাইয়া আক্তার বলেন, স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় বন্দি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সেবা দেওয়া যায় না। রোগীকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়। অনেক সময় হাসপাতালে নেওয়ার পথে রোগী মারা যায়। অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে অসুস্থ বন্দিকে দ্রুত বাইরের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে সমস্যা হয়।
দেশের সব কারাগারের হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সংকট রয়েছে। কারাগারে ৮৩টি অ্যাম্বুলেন্সের চাহিদা থাকলেও আছে মাত্র ২৩টি। যেসব কারা হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স নেই, সেখানে অন্য যানবাহন বা কারাগারের ডাবল কেবিন গাড়িতে রোগী বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এসব গাড়িতে অক্সিজেনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক রোগীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
কারা সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল ফরহাদ সমকালকে বলেন, নানা ধরনের অসুখে বন্দি মারা যান। তবে হার্ট অ্যাটাকে বেশি মৃত্যু হয়। মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব হতো যদি ঠিকমতো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যেত। বেশির ভাগ কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই। গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর যে বন্দির অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় তাদেরও পিকআপভ্যানে হাসপাতালে নিতে হয়। এ কারণে অনেক সময় রোগী পথেই মারা যান। এ ছাড়া বছরে দু-একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। চিকিৎসক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিজস্ব চিকিৎসক থাকলে বন্দি রাতে অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে চিকিৎসা করানো যেত। অস্থায়ী যে ডাক্তাররা চিকিৎসা দেন, তারা বাইরে থাকেন। রাতে তাদের ডেকে রোগীকে চিকিৎসা দিতে দেরি হয়ে যায়। মৃত্যু বেশি হওয়ার এটিও একটি কারণ।
গত ২৭ আগস্ট শরীয়তপুর জেলা কারাগারে বন্দি খোকন মিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর বাড়ি ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া মডেল টাউন এলাকায়। তিনি যৌতুকের মামলার আসামি ছিলেন। ২৬ আগস্ট দুপুরে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শরীয়তপুর জেলা কারাগারে নেওয়া হয়েছিল। পরদিন ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারাগারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় তাঁকে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
গত ২২ জুন রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মাহমুদ শাহরিয়ার ওরফে মনির নামে এক বন্দির মৃত্যু হয়। তাঁর বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি এলাকায়। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ২০১৯ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন। ২২ জুন তাঁকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়েছিল হাজিরার জন্য। ফের কারাগারে নিলে রাত ৯টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে কারা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, কারাগারে হাজতি ও কয়েদিদের মৃত্যু উদ্বেগের বিষয়। অনেক সময় বন্দিদের পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়, কারাগারে যথাযথ চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন বন্দিরা। অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পেছনে মূল কারণ চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব। প্রত্যেক বন্দির জীবন রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।
