ঢাকা রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬

বিতর্ক দিয়েই শেষ হলো সেই ব্রাহমা গরু অধ্যায়

বিতর্ক দিয়েই শেষ হলো সেই ব্রাহমা গরু অধ্যায়
×

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সাদিক এগ্রোর খামার থেকে গত বছর জুলাইয়ে জব্দ করা পাঁচটি ব্রাহমা জাতের গরুর একটি। পাঁচটিই বিক্রি করা হয়েছে মাংস ব্যবসায়ী খলিলের কাছে। সম্প্রতি তোলা -সংগৃহীত

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৫:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাহমা গরু। কোটি টাকা দাম। বংশমর্যাদাপূর্ণ জাত। ১২ লাখ টাকার ছাগল। এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর। সাদিক এগ্রো। ইমরান হোসেন। মাংস ব্যবসায়ী খলিল। সঙ্গে শুল্ক বিভাগ। দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সব মিলে ভিন্ন এক বাংলাদেশ।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। সরকার পতন। ইমরান, মতিউররা কারাগারে। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। আপাত স্বস্তি। হঠাৎ আবার ব্রাহমা, খলিল, দুদক এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এবং যেন সেই পুরোনো গল্পের ফিরে আসা।        

২০২১ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের টেকসাস থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছাল একটি চার্টার্ড বিমান। একে একে বেরিয়ে এলো ১৮টি ব্রাহমা জাতের গরু। আমদানিকারক সাদিক এগ্রো। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। শুল্ক বিভাগ সব গরু জব্দ করল। পাঠিয়ে দিল সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে। উচ্চ আদালতে রিট করল সাদিক এগ্রো। রিট খারিজ। এর মধ্যে তিনটি গরু মারা গেল। 

২০২৪ সাল। রমজান আসন্ন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিল, গরুগুলো জবাই করে মাংস হিসেবে তাদের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি করবে। কেজিপ্রতি দাম ২৮০ টাকা। ১৫টি গরু বিক্রির অনুমতি দেয় মন্ত্রণালয়। নিলাম হয়। গরুগুলো পায় বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর সভাপতি গরুর আমদানিকারক সাদিক এগ্রোর সেই ইমরান হোসেন। 

ফলাফল আবার জালিয়াতি। ১৫ গরুর ১০টি জবাই হয়। গোপনে ৫টি চলে যায় সাদিক এগ্রোতে। পরে একটি গরু তোলা হলো জাতীয় প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনীতে। ‘ব্রাহামা জাতের গরু দেখলেন প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। তখনও জালিয়াতির ঘটনা অজানা।

এরপর এলো কোরবানির ঈদ। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদিক এগ্রোতে ‘কোটি টাকায় বিক্রি হলো খানদানি গরু’ শিরোনামে খবর বের হলো। দুই কোটি ৬০ লাখ টাকায় তিন গরু কিনে ক্রেতা হজে গেলেন। ঈদের কয়েকদিন আগে ঘটল আলোচিত ছাগলকাণ্ড। ক্রেতা আয়কর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের ছেলে। দেশজুড়ে শোরগোল। মতিউর গ্রেপ্তার। সাদিক এগ্রো উচ্ছেদ। 
‘খামারি-মন্ত্রণালয় মিলেমিশে ব্রাহমা জালিয়াতি’ শিরোনামে খবর বের হয় গণমাধ্যমে। সামনে আসে ১৫ ব্রাহমার ৫টি গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা।    

দৃশ্যপটে দুদক। ৩ জুলাই, ২০২৪। পাঁচ গরু জব্দ। উত্তাল ১৬ জুলাই, সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা। আসামি ইমরানসহ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তা। গরুগুলোর আশ্রয় আবার সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন খামারে।   

আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন। এ বছরের ৩ মার্চ গ্রোপ্তার হন ইমরান। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে। 
হঠাৎ আবার আলোচনায় ব্রাহমা গরু। সোশ্যাল মিডিয়ায় সয়লাব। এবার দৃশ্যপটে রাজধানীর শাহজাহানপুরে ৫৯৫ টাকায় মাংস বিক্রি করে আলোচনায় আসা খলিল। সঙ্গে দুদক ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ১২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ব্রাহমা গরুর মাংস।  

খুঁজতে গিয়ে যা জানা গেল
১৯ সেপ্টেম্বর। কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে থাকা পাঁচটি ব্রাহমা গরু বিক্রির নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ। ২৪ সেপ্টেম্বর খামার চত্বরে নিলাম। ‘চাকা বাংলা ডিজিটাল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পুরো প্রক্রিয়া প্রচার করে। তাতে দেখা যায়, নিলামে উপস্থিত ছিলেন ১০ থেকে ১২ জন। ছিলেন খলিলুর রহমানও। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন খামারের এক কর্মকর্তা সমকালকে বললেন, আগে থেকেই খলিলকে গরুগুলো দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। নিলামে অংশগ্রহণকারী বাকিরাও খলিলের লোক। 
‘চাকা বাংলা ডিজিটাল’ ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন এস এম রিপন বলেন, ‘আমি সোর্সের মাধ্যমে জেনে নিলাম। প্রক্রিয়ার ভিডিও ধারণ করতে সাভারে কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন খামারে গিয়েছিলাম। তবে আমাকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয়নি। সেখানে কোনো গণমাধ্যমকর্মীও ছিলেন না। পরে এক কর্মকর্তার কাছ থেকে ভিডিও নিয়ে ফেসবুকে দিয়েছি।’ 

খলিলুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘নিলামে অংশ নেন ১৩ জন। আমি তিনটি গরু নিলামে পেয়েছি। বাকি দুটি গরু আমার এক বড় ভাই সাইদ পেয়েছেন। সাইদ পরে গরুগুলো আমাকে দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আমাকে ফোন করে নিলামে অংশ নিতে বলেন। আমি ১২০০ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি করেছি। সবার সামনে গরু জবাই করা হয়েছে।’

মৃত গরু জবাইয়ের অভিযোগ বিষয়ে খলিল বলেন, ‘একটি গরু জবাইয়ের একটু আগে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মারা যায়নি। এখন আমার বিরুদ্ধে ফেসবুক ও ইউটিউবে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’ 
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জারি করা কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের গবাদি পশু নিলামের শর্তে বলা হয়, নিলামের গবাদি পশু জবাই করে খামার থেকে মাংস নিতে হবে। কিন্তু ১৯ সেপ্টেম্বর ব্রাহমা গরু নিলামের জন্য প্রচারিত বিজ্ঞপ্তির সেই শর্ত রাখা হয়নি। আগের নীতিমালা পরিবর্তন না করেই নতুন নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গবাদি পশু সরবরাহ নিতে হবে। তিন দিনের মধ্যে নির্ধারিত কমিটির উপস্থিতিতে পশু জবাই নিশ্চিত করতে হবে। 

নিলামে ২৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকায় পাঁচটি গরু কেনেন খলিল। পরে খিলগাঁওয়ে তাঁর দোকানের সামনের সড়কে সেগুলো জবাই করেন। প্রতি কেজি মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। পাঁচ ব্রাহমার মাংস বিক্রি করেন প্রায় ৭২ লাখ টাকা। 

জবাইয়ের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. এবিএম খালেদুজ্জামান। তিনি এই ব্রাহমা জালিয়াতি মামলার আসামি। মামলার বাদী ছিল দুদক। গরু জবাইয়ের সময় দুদক কর্মকর্তা ও একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও উপস্থিত ছিলেন। 

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গরুগুলো সাভারের খামার থেকে গাড়িতে তোলার সময় খুবই ক্ষ্যাপাটে ছিল। খলিলের দোকানে আনার পরও চঞ্চল ছিল। তবে তিনটি গরু জবাইয়ের পর চার নম্বর গরুটিকে রশি বাঁধা অবস্থায় মাটিতে নিস্তেজ পড়ে থাকতে দেখা যায়। উপস্থিত লোকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘মরা গরু জবাই করছে কেন?’ উপস্থিত একজন অভিযোগ করেন, মরা গরু জবাইয়ের ভিডিও প্রকাশের পর খলিলের লোকজন তাঁকে হুমকি দিচ্ছে। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) ড. এবিএম খালেদুজ্জামান গতকাল সমকালকে বলেন, ‘গরু জবাই দেখতে আমার অফিসিয়াল দায়িত্ব ছিল না। এ বিষয়ে একটি কমিটি আছে; আমি সেই কমিটিতে নেই। কিন্তু দুদকের কর্মকর্তারা আমাকে ফোন করে ঘটনাস্থলে থাকতে বলেছিলেন। সে জন্য গিয়েছি। তবে আমাদের সামনে কোনো গরু মারা যায়নি।’ 
কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন খামারের পরিচালক ডা. মো. মনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গরুগুলো জব্দ করেছে দুদক। নিলামের জন্য দুদকই আদালতের অনুমতি নিয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছি।

পরিচালক বলেন, ‘আগের নিলামের শর্তে কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার থেকে গরুগুলো জবাই করে মাংস আকারে নিয়ে যাওয়ার শর্ত থাকলেও পরে তা কিছুটা শিথিল করা হয়। ক্রেতা তিন দিনের মধ্যে গরুগুলো নিয়ে তাঁর নিজস্ব জায়গায় জবাই করতে পারবেন। আমরা খলিলসহ অনেককে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে নিলামে অংশ নিতে বলেছিলাম। নিলাম কিংবা গরু জবাই পর্যন্ত কোনো অনিয়ম হয়নি। যিনি সর্বোচ্চ দাম হাঁকিয়েছেন, তাঁকেই আমরা গরু দিয়েছি।’ 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ‘গরুগুলো জব্দ করে দুদক আমাদের কাছে রেখেছে। আমরা শুধু প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে ছিলাম, এর বাইরে আর কিছু নয়।’ 
ব্রাহমা জালিয়াতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, ‘একটি গরু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। মারা যেতে পারে– এমন শঙ্কায় সব গরু নিলামে বিক্রির জন্য আদালতে আবেদন করেছিলাম। আদালত অনুমতি দিয়েছেন।’ 

বিতর্কিত ব্যক্তির হাতে ব্রাহমা গরু
মাংস ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান আওয়ামী লীগের শাসনামলে কখনও মাংসের দাম কমিয়ে আলোচনায় এসেছেন। কখনও নিম্নমানের মাংস বিক্রির কারণে সমালোচিত হয়েছেন। ক্রেতাদের সঙ্গে মারামারি, সড়ক দখল করে ব্যবসা করার মতো অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভোক্তাদের জন্য কম দামে মাংস বিক্রির প্রচারণা চালাতে তাঁকে ব্যবহার করা হতো। আবার লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বারবার ভারতীয় গরু আমদানির দাবিও তুলতেন তিনি। এখন অবশ্য সুলভ মূল্যের সেই বিক্রেতা খলিলের বিরুদ্ধে বেশি দামে মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠছে। 

গত বছর মার্চে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বক্তব্যে খলিলকে বলতে শোনা যায়, তাঁর কাছে আছে দেশের সবচেয়ে দামি অস্ত্র, যা এমপি-মন্ত্রীর কাছেও নেই। গণমাধ্যমে খলিলের অস্ত্র নিয়ে নানা সংবাদ প্রকাশের পর এক পর্যায়ে তিনি ঘোষণা দেন, জীবনে আর মাংস ব্যবসা করবেন না। রাজধানীতে তাঁর দুটি রেস্তোরাঁ, ফার্নিচার ব্যবসা ও একাধিক বহুতল ভবন রয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×