সরেজমিন: মিটফোর্ড হাসপাতাল
ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি রোগীর ২২ শতাংশই শিশু
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বেড়েছে। রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু। রোববার তোলা। ছবি: সমকাল
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | ১০:৪৮ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | ১০:৪৯
রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। এডিস মশাবাহিত এই ভাইরাস নিয়ে ভর্তি রোগীর ২২ শতাংশই শিশু। তাদের অনেকেই গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। তবে হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় আলাদা কোনো ওয়ার্ড বা কর্নার নেই। এতে করে রোগী ও স্বজনের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি।
মিটফোর্ড হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৭৬৪ জন। এর মধ্যে ৩৯৩ জনই শিশু, যাদের বয়স শূন্য থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হচ্ছে ২৫ নতুন ডেঙ্গু রোগী। এ হাসপাতালে চলতি বছর ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা
হাসপাতালের নতুন ভবনের ছয়তলায় মেডিসিন বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চলছে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা। তবে গতকাল রোববার সরেজমিন দেখা গেছে, ওই ভবনের পুরুষ ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৫২টি; কিন্তু সেখানে ভর্তি ৮৬ রোগী। তাদের মধ্যে ৪৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকেই রাখা হচ্ছে মেঝেতে।
শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন, শিশু বিভাগেও নেই কোনো আলাদা ডেঙ্গু কর্নার বা মশারির ব্যবস্থা। টঙ্গী থেকে আসা বাবলু মিয়া তাঁর ছেলেকে নিয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, শয্যা পাইনি, তাই মেঝেতেই ছেলেকে নিয়ে আছি। সব রোগীকে একসঙ্গে রাখছে, মশারি নেই, এতে অন্যরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে।
কেরানীগঞ্জ থেকে আসা আরেক রোগী শেখ রোমানের বাবা হারুন শেখ বলেন, আমার ছেলে এত অসুস্থ, বিছানা থেকেও উঠতে পারে না, অথচ মশারিও টাঙানো যাচ্ছে না। তিন দিন ধরে ভর্তি, এখনও কোনো শয্যা মেলেনি।
যদিও গত ১৭ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসায় পৃথক কর্নার এবং মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।
ছয় ও সাততলার চারটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো শয্যায় দুই রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের অধিকাংশ মশারিও ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে নতুন রোগীও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে।
শিশুদের উপসর্গ জটিল
চিকিৎসকদের ভাষ্য, গেল দুই মাস ধরে শিশুদের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার বেড়েছে। তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, চোখব্যথা, শরীরে র্যাশ, বমি, রক্তক্ষরণ, পেট ফাঁপা এবং পানিশূন্যতার মতো উপসর্গ নিয়ে আসছে অধিকাংশ রোগী। অনেকেই আবার শক সিনড্রোম বা দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছে।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আহমেদ হোসেন সমকালকে বলেন, অনেকেই গুরুতর অবস্থায় আসছে। মশারির ব্যবহার জরুরি; কিন্তু বাস্তবে তা অনেক সময় সম্ভব হচ্ছে না। ডেঙ্গু রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে রোগীরা দেরিতে আসছে।
সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণ ছিল তুলনামূলক কম। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৪, যা জুনে দাঁড়ায় ১২৪ জনে। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্ত হয় ২৩১ জন, আগস্টে ৩২৭ এবং সেপ্টেম্বরে ৪৮৩ জন। চলতি মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৪৮৩ ডেঙ্গু রোগী।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মফিজুর রহমান মোল্লা বলেন, অধিকাংশ রোগীই পদ্মাপারের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে এবং তারা দ্বিতীয়বার সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে জটিলতা বেশি। জ্বর হলে অবহেলা না করে পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত ডেঙ্গু কিনা।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাজহারুল ইসলাম খান বলেন, চিকিৎসক ও নার্স সংকট এবং স্থান স্বল্পতার কারণে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা যায়নি। সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি আমরা জানি। কিন্তু অবকাঠামো ও জনবল না থাকলে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ ছাড়া ডেঙ্গু এখন প্রায় জরুরি চিকিৎসার পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু জেলা পর্যায়ে সেই ব্যবস্থাপনা কাঠামো নেই। ফলে ঢাকার হাসপাতালগুলোতেই রোগীর চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ালে চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৪৫ জনে। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৯৫০ জন। এতে চলতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৮৪৯ জনে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ মারা যাওয়া ব্যক্তি বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাব বলছে, সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার ৮৬৬ জন। এ সময় মৃত্যু হয়েছে ৭৬ জনের। এরপর আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬, জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪, জুনে ৫ হাজার ৯৫১ ও অক্টোবরে (১৯ তারিখ পর্যন্ত) ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৫০৭ জন।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে গত সেপ্টেম্বর মাসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ মাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের। তার আগের মাসগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে ৪১, আগস্টে ৩৯, জুনে ১৯, মে ও ফেব্রুয়ারিতে তিনজন করে এবং জানুয়ারিতে ১০ জনের মৃত্যু হয়। মার্চে কোনো মৃত্যু হয়নি।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাদের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা ২৮৫ জন। এ ছাড়া বিভাগভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী ঢাকা বিভাগে ১৩১, ময়মনসিংহে ৫৬, চট্টগ্রামে ১১৮, খুলনায় ৭১, রংপুরে ২০, রাজশাহীতে ৭৯ এবং বরিশালে ১৯০ জন ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে দুই হাজার ৭৯৩ ডেঙ্গু রোগী।
- বিষয় :
- রাজধানী
- মিটফোর্ড হাসপাতাল
- ডেঙ্গু রোগী
- শিশু
