চূড়ান্ত শুনানি শুরু
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়েছিল ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে
আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৪:০৫ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৪:৩৭
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে গতকাল মঙ্গলবার রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া।
শুনানির পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। এতে করে ১০ বছর ধরে দেশে আর কোনো বৈধ নির্বাচনই হয়নি।
শুনানিতে শরীফ ভূঁইয়া সংবিধান ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি এবং সংবিধান সংশোধন করে কীভাবে গত তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেসব বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা জরুরি। ১৪ বছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেশ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণের অভিপ্রায়ে; অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য। এ ব্যবস্থা না থাকায় দেশে একতরফা তিনটি সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অনির্বাচিত লোকজন ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করেছে। ফলে সার্বভৌমত্ব, মৌলিক অধিকার কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সংবিধানের অন্য কাঠামোগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সাংবিধানিক বিষয় ব্যাখ্যা করার কিছু রীতি-নীতি আছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করার ক্ষেত্রে সেই রীতি-নীতি অনুসরণ করেননি। অথবা প্রয়োগে করতে ভুল করেছেন। সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় ভুল করায় ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এ কারণে উনারা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, সংবিধান ব্যাখ্যা করতে হলে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে তার ফল কী দাঁড়াবে, তা বিবেচনায় নিতে হয়। বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। সেই ইতিহাসও কিন্তু সংবিধান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেননি। তারা দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নেননি। বায়বীয় ধারণার ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছেন।
শুধু তাই নয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়টি আইনি ও কাঠামোগতভাবে দুর্বল। উনাদের রায়ের ফলে যে দেশ গণতন্ত্রহীন হয়ে যাবে, স্বৈরতন্ত্র-একনায়কতন্ত্র চালু হবে এবং এক হাজার মানুষকে জীবন দিয়ে সরকার পরিবর্তন করতে হবে, এসব কোনো কিছুই উনারা বুঝতে পারেননি। একটি সাংবিধানিক আদালত হিসেবে এগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। উনারা আইন বুঝতে ও প্রয়োগ করতেও ভুল করেছেন। ফলে এটা পুরোপুরি ভুল সিদ্ধান্ত। ভুল একটা রায়।
এদিন আদালতে বিএনপি মহাসচিবের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, জামায়াত সেক্রেটারির পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির ও রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। আজ বুধবার এ বিষয়ে ফের শুনানি চলবে।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে নতুন করে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার আপিল করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালের ১০ মে প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল ঘোষণা করেন। ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অক্টোবরে একটি আবেদন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর আগে রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আরেকটি আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে অক্টোবরে আরেকটি আবেদন করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া নওগাঁর রানীনগরের নারায়ণপাড়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন।
চারটি আবেদনের ওপর শুনানি শেষে নতুন শুনানির সিদ্ধান্ত দেন আপিল বিভাগ। ওই দিন প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, লিভ দিয়ে আমরা পুরো বিষয়টি শুনব। আপিলের সঙ্গে অপর রিভিউ আবেদনগুলোও শুনানির জন্য আসবে।
সাত খুনের মামলার শুনানি পেছাল
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যা মামলায় আপিল আবেদনের শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ। আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ গতকাল এ আদেশ দেন। এদিন রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
- বিষয় :
- শুনানি
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার
