এস আলমসহ ৬৭ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
ইসলামী ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকা লোপাট
দুদকের লোগো
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১২
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ৬৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইসলামী ব্যাংক থেকে ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে গতকাল রোববার দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান কমিশনের ঢাকা-১ কার্যালয়ে মামলাটি করেন।
এজাহারে বলা হয়, গ্রুপের সহযোগী কোম্পানি এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম স্টিলস ও এস আলম ট্রেডিং কোম্পানির নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৩৪টি ডিলের মাধ্যমে ৯ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা লোপাট করা হয়। এটা বর্তমানে লভ্যাংশসহ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। দুদক আইন অনুযায়ী মুনাফা-আসলে সমুদয় টাকা আত্মসাতের শামিল। দুদকের ইতিহাসে একক ঘটনায় অর্থ আত্মসাতের এটিই সবচেয়ে বড় মামলা। দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গতকাল ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
এ ঋণ দেওয়া ও নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে ইস্যু করা বিধি, পলিসি ও সার্কুলার লঙ্ঘন করেছে। এই তিনটি কোম্পানির অনুকূলে অপ্রতুল জামানত রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনে বিদ্যমান উচ্চ ঋণের পরিমাণ বিবেচনা করা হয়নি। গ্রাহকের ব্যবসায়িক টার্নওভার ঋণসীমার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করা হয়নি। আসামিরা ইসলামী ব্যাংকের সফটওয়্যারে (টর্চ) জালিয়াতির মাধ্যমে অনুমোদনবিহীন বিনিয়োগ এবং ঋণের নামে ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে মোহাম্মদ সাইফুল আলম তাঁর মালিকানাধীন এস আলম গ্রুপের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মাধ্যমে ওই অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর, রূপান্তর করে মানি লন্ডারিং অপরাধ করেছেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুদক সাবেক মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক, আমলাসহ বিগত সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রভাবশালীদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে। ১১টি যৌথ টিম গঠন করা হয়। একের পর এক মামলা করা হয়। কিছু মামলায় অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। জালিয়াতি করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে এস আলমের বিরুদ্ধে দুদক এ পর্যন্ত ২০টি মামলা করেছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ১৩৪টি ডিলের মাধ্যমে ৯ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা আহসান এন্টারপ্রাইজ, ইমপ্রেস করপোরেশন, এপারচার ট্রেডিং, ইউনিক ট্রেডার্স অ্যান্ড বিজনেস হাউস, এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল, ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্স, আহসান এন্টারপ্রাইজ, আনসার এন্টারপ্রাইজ, দুলারী এন্টারপ্রাইজসহ নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। এগুলো পরে এস আলমের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সোনালী ট্রেডার্স, মালিক মো. শহিদুল আলম (এস আলমের ভাই), গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, মালিক মো. রাশেদুল আলম (এস আলমের ভাই), এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., এস এস পাওয়ারসহ এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
গত ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার এস আলম ট্রেডিং কোম্পানির হিসাব থেকে ৩৭ কোটি টাকা রূপালী ব্যাংক, ও আর নিজাম রোড শাখার গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশনে স্থানান্তর করা হয়, যা সাইফুল আলমের ভাই রাশেদুল আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। পরে ওই অর্থসহ গ্লোবাল ট্রেডিং, জেনেসিস টেক্সটাইলস, এস আলম স্টিলস, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও সোনালী কার্গো লজিস্টিকস লিমিটেডের মাধ্যমে আরও টাকা পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরিত হয়ে একই দিনে রূপালী ব্যাংকের ঢাকার দিলকুশা শাখার এস এস পাওয়ার-১ লিমিটেডের হিসাবে জমা হয়। পরদিন ৫ ডিসেম্বর ওই হিসাব থেকে ২৯০ কোটি টাকার সমপরিমাণ (২ কোটি ৩৫ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার) ব্যাংক অব চায়নার সিঙ্গাপুর শাখায় এস এস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অফশোর অ্যাকাউন্টে পাচার করে আত্মসাৎ করা হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলাটি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন– এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসান, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আব্দুস সামাদ, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলসের এমডি ওসমান গনি, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক রাশেদুল আলম, এস আলম স্টিলসের শেয়ারহোল্ডার সহিদুল আলম, এস আলম গ্রুপের পরিচালক ফারজানা পারভীন, ইম্প্রেস করপোরেশনের মালিক মো. ইসমাইল, এপারচার ট্রেডিং হাউসের মালিক এস এম নেছার উল্লাহ, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ইভিপি মিফতাহ উদ্দীন, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাব্বির, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব উল আলম, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ কায়সার আলী, এসভিপি মোহাম্মদ ইহসানুল ইসলাম, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল কবির, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহের আহমেদ চৌধুরী, সাবেক চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হাসান, সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।
- বিষয় :
- দুদক
- দুদকের মামলা
- এস আলম
- ইসলামী ব্যাংক
