ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

এইডস টেস্টিং কিটের তীব্র সংকট, বিনামূল্যের সেবায় লাগছে টাকা

এইডস টেস্টিং কিটের তীব্র সংকট, বিনামূল্যের সেবায় লাগছে টাকা
×

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫১ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশজুড়ে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে এইচআইভি শনাক্তে ব্যবহৃত টেস্টিং কিটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ছয় মাস ধরে দেশের ২৩টি সরকারি কেন্দ্রে তিন ধাপের বাধ্যতামূলক পরীক্ষার মধ্যে কেবল প্রথম ধাপে ‘ডিটারমাইন’ পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি দুটি ‘ইউনিগোল্ড’ ও ‘ফার্স্ট রেসপন্স’ কিট নেই বলে পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বিনামূল্যের রক্ত পরীক্ষার পরিবর্তে রোগীদের ব্যক্তিগতভাবে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে বাইরে গিয়ে তা করাতে হচ্ছে। এতে অনেকেই পরীক্ষা না করিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় হুমকি।

পরীক্ষায় ভাটা, ঝুঁকি বাড়ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনএএসসি) তথ্য বলছে, গত এক বছরে (নভেম্বর ২০২৪-অক্টোবর ২০২৫) দেশে নতুন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭২ জন; মারা গেছেন ১৮৬ জন। বর্তমানে ১৪টি সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৪৫। এর আগের বছর এসব কেন্দ্রে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৩০ জন। মারা যান ২৩৪ জন। জাতিসংঘের এইডস-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডস জানিয়েছে, দেশে সামগ্রিক সংক্রমণের হার কম হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নিয়মিত পরীক্ষা ব্যাহত হওয়ায় অজানা সংক্রমণকারীরা সমাজে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে শুরু হয় বিনামূল্যে এইচআইভি শনাক্তকরণ কর্মসূচি। তবে অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার পর থেকেই কিট সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। চলতি বছরে ১ লাখ ১০ হাজার ডিটারমাইন কিট কেনা হলেও ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিট যথেষ্ট পরিমাণে সংগ্রহ করা হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিট গত ৬ মাস ধরে নেই। কিটের জন্য দুইবার চিঠি দিলেও কিট মেলেনি। এ কারণে প্রথম পরীক্ষা করার পর অনেক রোগী আর হাসপাতালে আসছেন না। এমন একজন ফারুক মিয়া (ছদ্মনাম) ঝাড়কাঠি গ্রামের,  পেশায় গাড়িচালক। প্রথম পরীক্ষায় পজিটিভ। কিট সংকটে ‘এলাইজা’ পরীক্ষা করতে অন্য হাসপাতালে যেতে বলা হয়। এরপর দুই সপ্তাহ হলেও তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। শুধু ফারুক নন, এ কেন্দ্রে গত মাসে ১০-১২ জনের এই পরীক্ষা দেওয়ার পর আর আসেননি। নিজের পরিচয় গোপন রাখা ও বিনামূল্যের পরীক্ষায় ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা দিয়ে করতে হবে জেনে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিপুল পরিমাণ এআরটি ওষুধ অরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে ওষুধ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
এ চিত্র শুধু সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের নয়; বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যশোর, ঢাকা, খুলনা, কক্সবাজার, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ প্রায় সব কেন্দ্রেই গত ছয় মাস ধরে ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিটের ঘাটতি চলছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে রোগী শনাক্তে কেবল এক ধাপের পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক নির্দেশনার পরিপন্থি।

রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, গত ছয় মাস ধরে ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিট নেই। অনেক রোগী প্রথম ধাপের পরীক্ষার পর আর ফিরে আসছেন না। কেউ কেউ অন্যত্র গিয়ে পরীক্ষা করাচ্ছেন; অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছেন। 

শিশুদের ওষুধেও ঘাটতি
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তিন মাস ধরে এইচআইভি পজিটিভ শিশুদের ওষুধের তীব্র সংকট চলছে। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরা প্রাপ্তবয়স্কদের ওষুধ ভেঙে শিশুর ডোজে দিচ্ছেন। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রের এআরটি ফোকাল পার্সন মো. শাওন। তিনি বলেন, একাধিকবার চিঠি দিলেও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। 

প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্প স্থবির
গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তা থাকলেও নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন না হওয়ায় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ৩৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৬ মাস বেতন বন্ধ রয়েছে। ১০ নভেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদনের কথা থাকলেও চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে কর্মীদের।
জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাবেক পরিচালক ডা. শাহ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, কিট সংকটে রোগী শনাক্ত বিলম্বিত হচ্ছে। এতে অজানা সংক্রমণকারীরা শনাক্ত না হয়েই সমাজে থেকে যাবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে পারে। তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় কিট ও ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং জোরদার করার আহ্বান জানান।

সংকট দ্রুত কাটবে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি প্রোগ্রামের সিনিয়র ম্যানেজার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, চলতি বছর জুলাইয়ে দুই ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার ডিটারমাইন কিট কেনা হয়। ফলে এই কিটের সংকট নেই। আর গত জুলাইয়ে ইউনিগোল্ড কেনা হয়েছে ১ হাজার, যেগুলো বণ্টন করা হয়নি। ফার্স্ট রেসপন্স ১ হাজার ৪৪৮টি কেনা হয়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় ২৩ কেন্দ্রে এ দুই কিটে কিছু সংকট থাকতে পারে। কিছু কিট ইতোমধ্যে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই সংকট কেটে যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান সমকালকে বলেন, কিট ও ওষুধ সংকটের বিষয়টি জানি। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। অনুমোদন পেলেই সব সংকট কেটে যাবে।

আরও পড়ুন

×