এইচআইভি রোগীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা শুরুর আগেই ‘ভাইরাল লোড’ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনএএসসি)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, এই পরীক্ষা করা উচিত ওষুধ শুরুর ছয় মাস বা এক বছর পর। বিশেষজ্ঞদের মতে, শনাক্তের পরপরই এই পরীক্ষা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিক পরিপন্থি এবং এতে সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে।
এইচআইভি শনাক্ত ব্যক্তি নিয়মিত ছয় মাস ওষুধ সেবনের পর শরীরে কী পরিমাণ ভাইরাসের উপস্থিতি আছে, তা জানতে এই ভাইরাল লোড পরীক্ষা করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভাইরাল লোড কিট কেনার পর তা মেয়াদোত্তীর্ণের ঝুঁকিতে পড়ায় দ্রুত সময়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে এইচআইভি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২৩ জুন জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির উপপরিচালক জুবাইদা নাসরীন সই করা চিঠিতে লিখেছেন, ভাইরাল লোড টেস্টিং কিট আশানুরূপ ব্যবহার না হওয়ায় প্রোগ্রামের গুণগত মানের অবনতি এবং ভাইরাল লোড কিটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর দায় সংশ্লিষ্ট সবার ওপর বর্তাবে।
চিকিৎসাকেন্দ্রের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মৌখিকভাবে তাদের বলা হয়েছে পরীক্ষাগুলো করা হলেও নিবন্ধন খাতায় তা না তুলতে।
জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাবেক পরিচালক ডা. শাহ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন এই ভাইরাস প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধারণত শনাক্তের ছয় মাস বা এক বছর ওষুধ ঠিকভাবে খাওয়ার পর রোগীর ভাইরাল লোড পরীক্ষা করা হয়। শুরুতেই এই পরীক্ষা করার চিকিৎসাগত কোনো যুক্তি নেই। এতে রোগীর উপকার হয় না, বরং সরকারি অর্থের অপচয় হয়।
বাংলাদেশে ভাইরাল লোড কিট আসে ভারত থেকে। গত বছর এপ্রিলে এনএএসসি ১০ হাজার কিট কেনে, যার মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের ২ নভেম্বর। ফলে স্বল্পমেয়াদি কিট দ্রুত ব্যবহারের জন্য দেশের ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্রে নির্দেশনা পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮২, মৌলভীবাজারে ৩৩, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ১৫, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ১৪ ও যশোরে ২০টি মেয়াদোত্তীর্ণ কিট মজুত আছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন কিট মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের ১৪টি সেন্টারে প্রায় আট হাজার ২৪৫ এইচআইভি এইডস রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ৮৫০ জন, যশোরে ২৪৫ জন, বগুড়ায় ৩৪০ জন, বরিশালে ১৬০ জন, কুমিল্লায় ৪৭০ জন, মৌলভীবাজারে ১৬০ জন, সিরাজগঞ্জে ২৫৫ জন, ঢাকা সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে এক হাজার ৩২০ জন, খুলনায় ৫৫০ জন, কক্সবাজারে ৪০১ জন, উখিয়ায় ৮৮০ জন, সিলেটে ৫৩৭ জন, চট্টগ্রামে ৬১৮ জন ও ময়মনসিংহে ১৮১ জন রয়েছেন। এসব রোগীর এই পরীক্ষা করা জরুরি।
জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির উপপরিচালক জুবাইদা নাসরীন বলেন, ভাইরাল লোড কিটের মেয়াদোত্তীর্ণ ঠেকাতেই শনাক্তের শুরুতে এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ডব্লিউএইচওর সব নিয়ম আমরা তো মানি না। কিছু বিষয়ে আমরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিই। এইচআইভি রোগীর চিকিৎসা পদ্ধিতি উন্নতি করার জন্য স্বল্পমেয়াদি এই পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পরীক্ষা চলমান থাকবে। শুরু হয়েছে গত জুন থেকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল সমকালকে বলেন, অল্প টাকা দিয়ে স্বল্পমেয়াদি কিট কেনা হয়েছে। এখানে পরিকল্পনা ও তদারকিতে বড় ঘাটতি রয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার পর নিবন্ধন খাতায় না তোলা মানে অনিয়ম ও দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, শুধু পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ফলে মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রোগ্রামের সিনিয়র ম্যানেজার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, উৎপাদনের পর ১৮ মাস এই কিট ব্যবহার উপযোগী থাকে। কিট কেনার পর দেশে আসতে সময় লাগে চার মাসের বেশি। ফলে ব্যবহারের সময় কমে যায়। তাই শনাক্তের শুরুতেই পরীক্ষা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, ভাইরাল লোড কিটের মেয়াদোত্তীর্ণ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- এইডস
