ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অধ্যাদেশের চূড়ান্ত অনুমোদন

স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে আরও এক ধাপ

স্বাধীন বিচার  বিভাগের পথে আরও এক ধাপ
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য খসড়া অধ্যাদেশের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। সচিবালয় সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অধ্যাদেশ কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, নিয়োগ, কর্মের শর্তাবলি নির্ধারণসহ সবকিছু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করবে। অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশের পর আর্থিক ক্ষমতা পাবে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

বৈঠকের পর রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, আগামী সপ্তাহেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫-এর গেজেট জারি করা হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের গত ২০-৩০ বছরের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। অবশেষে আমরা মাসদার হোসেনের মামলার রায় পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠার শেষ ধাপ সম্পন্ন করলাম।

১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তাঁর সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেন। সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপে সরকারের অনুমোদন মিলল।

আইন উপদেষ্টা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সব রাজনৈতিক দল এর পক্ষে মত দিয়েছে। বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের নীতিগত অনুমোদন আগেই হয়েছিল। উপদেষ্টা পরিষদে এটা চূড়ান্ত অনুমোদন হলো। 

অধ্যাদেশের বিষয়বস্তু তুলে ধরতে গিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, বিদ্যমান নিয়মে অধস্তন বা নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত। রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত মানে হলো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে তিনি এটি করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রণালয় কাজটি করে। বিচারকদের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করে আইন মন্ত্রণালয়। আইন উপদেষ্টা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত ও ছুটিসংক্রান্ত বিষয়, এমনকি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, কর্মের শর্তাবলি নির্ধারণ–সবকিছু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করবে। আইন মন্ত্রণালয় যেটা করত, সেটা সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়ের হাতে চলে যাবে।

এ বিষয়ে আরও ব্যাখ্যা দিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, শুধু বিচারকাজে নিয়োজিত যারা আছেন, সেই বিচারকদের বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের হাতে চলে যাবে। কিন্তু বিচার বিভাগের যারা অন্য কোনো জায়গায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, যেমন– নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, আইন কমিশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়গুলো আইন মন্ত্রণালয়ের হাতেই থাকবে। কখন থেকে এই সিদ্ধান্তের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যাবে– এ প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতের সচিবালয় সম্পূর্ণ কার্যকর হয়ে যাবে।

উচ্চ আদালতের সচিবালয়ের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা আর্থিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, যে কোনো ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের সচিবালয়ের নেতৃত্বে একটা যাচাই-বাছাই কমিটি থাকবে। যাচাই-বাছাই কমিটি প্রকল্প গ্রহণ করবে। সেই প্রকল্প একটা কমিটির কাছে পাঠানো হবে পরামর্শের জন্য। প্রধান বিচারপতির অনুমোদনক্রমে আপিল বিভাগের একজন বিচারক সেই কমিটির প্রধান থাকবেন। সুপারিশকৃত প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় যদি ৫০ কোটি টাকার কম হয় সে ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি এটা অনুমোদন করবেন। ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে এটা পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে একনেকের সভায় উপস্থাপন করবেন প্রধান বিচারপতি। আসিফ নজরুল বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারকদের সঙ্গে সচিবালয়ের সব ব্যয় সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতের বাজেট অনুমোদন করা হবে। এই বাজেট ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা উচ্চ আদালতের থাকবে।

আইন উপদেষ্টা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরামর্শ দিতে আরও একটি কমিশন গঠন করা হবে। এতে পৃথক সচিবালয়ের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত হবে। ফলে তাদের স্বাধীনতায় কোনো প্রভাব পড়বে না। 

তিন থেকে চার কার্যদিবসের মধ্যে গণভোটের আইন
গণভোট সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, গণভোট করার জন্য আইন করার প্রয়োজন রয়েছে। গণভোটের বিষয়ে অধ্যাদেশ সরকার দ্রুত করতে যাচ্ছে। আগামী তিন-চার কার্যদিবসের মধ্যে এটি হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে আনা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ১৪ বছর আগে দেওয়া রায় পুরোটাই বাতিল করেছেন আপিল বিভাগ। ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর ও এ-সংক্রান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে বৃহস্পতিবার রায় দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে বলা হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত বিধানাবলি এ রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিধানাবলি ভবিষ্যৎ প্রয়োগ যোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে বলে রায়ে এসেছে।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা বলেন, আজ একটি ঐতিহাসিক রায় হয়েছে। দীর্ঘদিন সংগ্রাম করার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাওয়া গিয়েছিল। এটি ভোটের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখা গিয়েছিল। ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হতো। এটা স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাবেক একজন বিচারপতির নেতৃত্বে রায় দিয়ে এটিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর এর সুযোগ নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে বাতিল করে। অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, প্রথমে পঞ্চদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হয়েছে মাস দু-এক আগে এক রায়ে। আজ (বৃহস্পতিবার) সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ বলে যে রায় দিয়েছিলেন, সেটা বাতিল হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, এ মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলতে পারি। কিন্তু এটা কার্যকর হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে। কারণ, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয়। এখন সংসদের অস্তিত্ব নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক আগামীতে যে সংসদ গঠিত হবে, সেই সংসদ যখন ভেঙে যাবে, তারপর ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে।

উপদেষ্টা পরিষদের ৮২ শতাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, গত বছরের ৮ আগস্ট থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদের ৫১টি বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকের সিদ্ধান্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছিল বৈঠকে। এসব বৈঠকে ৩৯৪টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ৩২২টি (৮২ শতাংশ)। বৈঠকে ‘ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর খসড়া অনুমোদন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫ ও আমদানি নীতি নিয়ে আলাপ হয়েছে। কিন্তু আরও আলোচনার জন্য ওইগুলো ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রেস সচিব বলেন, পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফেরত পাঠানো ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের বিষয়ে আলাপ হয়েছে। এটা নিয়েও আরও আলোচনা হবে।

 

 

আরও পড়ুন

×