মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের আলোচনা সভায় বক্তারা
পুলিশ কাউকে গুলি করে না তাদের দিয়ে করানো হয়
ছবি: সমকাল
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশাল নগরীর সাগরদী এলাকায় ভাসানী সড়কের বাসিন্দা শিক্ষানবিশ আইনজীবী রেজাউল করীম (২৯) কারাগারে অসুস্থ হলে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। মাদক ব্যবসার অভিযোগে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. মহিউদ্দিন তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রেজাউলের বাবা ইউনুস মিয়া। এই মামলার তদন্তও করে পুলিশ। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। অভিযোগ মিথ্যা আখ্যায়িত করে প্রতিবেদন দেওয়ায় দায়মুক্ত হন মহিউদ্দিন। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হলেও তা ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ ইউনুস মিয়ার।
স্ত্রী জেসমিন বেগমকে সঙ্গে নিয়ে গতকাল বরিশাল ক্লাব মিলনায়তনে আসেন ইউনুস। তারা চিৎকার করে অভিযুক্ত মহিউদ্দিনের ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘আমার রেজাউলকে খুনের পর মহিউদ্দিন পুলিশ পদক পেয়েছে। কার কাছে বিচার চাইব?’
শুধু ইউনুস-জেসমিন দম্পতি নন, আরও কয়েকজন এসেছিলেন একই আকুতি নিয়ে। তাদের কারও সন্তান, কারও ভাই এবং কারও স্বজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিলে নিখোঁজ হন। পোশাকি ভাষায় যেটাকে বলা হয় ‘গুম’।
গতকাল শনিবার বরিশাল ক্লাবে ‘নির্যাতন-সংক্রান্ত আলোচনা’ সভার আয়োজন করে মানবধিকার সংস্থা অধিকার। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজন ও নির্যাতিতরা এতে অংশ নেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন গুম কমিশনের সদস্য নাসির উদ্দিন হেলাল ও বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আহসান হাবিবসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। সভা পরিচালনা করেন অধিকারের নির্বাহী পরিচালক ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য নাসির উদ্দিন এলান।
বক্তারা অভিমত দেন, যারা অবৈধ পস্থায় ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করেন, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তাদের দিয়ে প্রতিবাদকারীদের গুম-নির্যাতন করানো হয়। পুলিশ কাউকে গুলি করে না, তাদের দিয়ে গুলি করানো হয়। এসব বন্ধে দেশে আইনের কোনো কমতি নেই। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে আইনের সঠিক প্রয়োগ হয় না।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের নাসিমা খাতুন জানান, তাঁর পরিবারের চারজনকে র্যাব ধরে নিয়ে গুম করেছে। ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে চাওয়ায় ২০১০ সালে তাঁর স্বামী মিজানুর রহমানকে গুম করা হয়। এরপর ২০১১ সালে দেবর খোরশেদ জমাদ্দার, ভাই মিজান সিকদার ও বড় ভাইয়ের ছেলে সুমন সিকদারকে সাদা পোশাকধারীরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন।
ষাটোর্ধ্ব ফিরোজা বেগম এসেছিলেন ২০১৪ সালে নিখোঁজ তাঁর দুই সন্তান কালু খান ও মিরাজ খানের কথা জানাতে। বরিশাল নগরের করিম কুটির এলাকার বাসিন্দা আবুল হায়দার নিখোঁজ হন ২০১০ সালে। তাঁর ছবি নিয়ে এসেছিলেন স্ত্রী রুমানা বেগম।
বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকন বলেন, সরকার তাদের নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য গুম-খুনের পথ বেছে নেয়। রাষ্ট্রের ভালো আইনগুলো অনুসরণের মানসিকতা তাদের থাকে না।
বরিশালের কারা তত্ত্বাবধায়ক মোয়াজ্জেম হোসেন প্রশ্ন তোলেন, গুমের পর ফেরত আসা ব্যক্তিরা রহস্যজনকভাবে চুপ হয়ে যান।
মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মাহবুব আলম দুলাল বলেন, আমিও গুমের শিকার পরিবারের একজন সদস্য। কলেজ অধ্যক্ষ ভগ্নিপতি কয়েক বছর আগে গুম হন। তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছে জানি না। তাঁর সন্তানরা এখন পর্যন্ত ইন্নালিল্লাহি পড়তে পারেনি। বাবার নামের আগে মরহুম লেখার সুযোগ পায়নি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির বরিশালের যুগ্ম সমম্বয়ক আবু সাইদ ফেরদৌস বলেন, গুমের রাজনীতি বন্ধে সংস্কার কমিশন কাজ করছে। কোনো দলের হাতে সংস্কার বাধাগ্রস্ত হলে প্রয়োজনে আরেকটি আন্দোলন করতে ছাত্র-জনতা রাস্তায় নামবে।
আলোচনা সভায় গুম ও নির্যাতনের বিষয়ে বেশি অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার পবিত্র কুমার হালদার বলেন, পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে চায়। আমাদের পর্যাপ্ত জনবল ও উপকরণ নেই। কনস্টেবলদের চার মাসের জন্য যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা যথেষ্ট নয়। পুলিশের মহাপরিদর্শকও কিছুদিন আগে অসহায়ভাবে বলেছেন, আমাদের কাজ করতে দেন।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার বলেন, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কোনো সংস্থা কর্তৃক জনগণ নির্যাতিত হলে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের আর কোনো জায়গা থাকে না। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। ন্যায়বিচারের চেয়ে অন্যায় বেশি হয়। পুলিশ কাউকে গুলি করে না, তাদের দিয়ে গুলি করানো হয়।
গুম কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে আইনের কোনো ঘাটতি নেই। গুম-নির্যাতন বিরোধী সব আইন দেশে আছে। এমনকি মানবাধিকার-সংক্রান্ত জাতিসংঘের যতগুলো সনদ রয়েছে, সবগুলোয় বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এমনটা হয়েছে। জনগণের উচিত, রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করা যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো খুন-গুম-নির্যাতন হবে না।
- বিষয় :
- পুলিশ
- মানবাধিকার
