ঝুঁকিপূর্ণ-অতিঝুঁকিপূর্ণ কোনো ভবন নিয়েই ব্যবস্থা নেই
লতিফুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৮ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় জরিপ চালিয়ে ২০২৩ সালের মার্চে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ভবনকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই সময় সাত দিনের মধ্যে ভবন খালি করে তিন মাসের মধ্যে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়। তবে প্রায় আড়াই বছর পার হলেও এসব ভবন এখনও দাঁড়িয়ে আছে বহাল তবিয়তে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে চিঠি চালাচালিতেই আটকা ভবন ভাঙার কার্যক্রম।
শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চার ভবনই নয়, রাজধানীর সরকারি সংস্থার এ রকম ৪২ ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকায় নাম উঠলেও সেগুলো ভাঙার ব্যাপারে কোনো হেলদোল নেই কারোর।
রাজউক সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ৭০৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২০৭ হাসপাতাল, ৩৬ থানা ও ৩০৪ ভবনের মধ্যে জরিপ চালানো হয়। জরিপে ১৮৭ ভবনকে ভূমিকম্প প্রতিরোধী (রেট্রোফিটিং) করা এবং ৪২টি ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়। সেই তালিকায় ছিল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিজি হাসপাতাল) তিনটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি, মাদ্রাসা বোর্ডের তিনটি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মাণ করা ৩০টি ভবন।
রেট্রোফিটিংয়ের তালিকায় ছিল ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির তিনটি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চারটি, মাদ্রাসা বোর্ডের ছয়টি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ১০টি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৫৪টি ভবন।
ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, ‘এক বছর আগে আমি পরিচালকের দায়িত্ব নিয়েছি। এই ইনস্টিটিউটের কোন কোন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমার জানা নেই।’
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক মনোয়ার জাহেদী সমকালকে বলেন, ‘যতদূর মনে পড়ে, বছর দুই আগে রাজউক এ রকম একটি তালিকা করেছিল। তবে এসব ভবন আমাদের না। বেসরকারি স্কুলের ভবন ছিল, ভবন ভাঙা ও রেট্রোফিটিংয়ের দায়িত্ব তাদের।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অতিঝুঁকিপূর্ণ চারটি ভবন ঘুরে দেখা যায়, ভবনের কোথাও কোথাও রয়েছে ফাটল। ছাদের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে গেছে রড। গত ২৯ এপ্রিল অবকাশ ভবনের দোতলার কার্নিশ ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা আহত হন।
গত শুক্রবারের ভূমিকম্পের সময় অবকাশ ভবনের তৃতীয় তলায় ছিলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েকজন বসেছিলাম। হঠাৎ ভবনটি দুলতে শুরু করে। তৎক্ষণাৎ কক্ষ থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে যাই। অনেককেই বিভিন্ন ভবন থেকে দৌড়ে ফাঁকা জায়গায় যেতে দেখি।’
এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী সমকালকে বলেন, ‘আমরা ভবনের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ কমিটি এনেছিলাম। তারা রাজউকের প্রতিবেদন চেয়েছিল। রাজউককে একাধিকবার চিঠি দিয়েও সে প্রতিবেদন পাইনি। পরে নিজেরাই পরীক্ষার উদ্যোগ নিলে বুয়েট জানিয়েছিল, চারটি পরীক্ষা করতে ৪৫ লাখ টাকা খরচ হবে। এই অর্থের সংস্থান করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।’
জরিপে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীতে ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ সাড়ে আট লাখ ভবন বড় মাত্রার (৭-এর বেশি) ভূমিকম্পে ধসে পড়বে। এর মধ্যে সেমিপাকা থেকে বহুতল ভবন রয়েছে। ঢাকায় বহুতল ভবন আছে ৭৫ হাজারের বেশি। সেই সময় ঢাকায় সরকারিভাবে নির্মিত ৩৭ শতাংশ নতুন ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিজি হাসপাতাল) নতুন ১৭ তলা একটি ভবন এবং অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
রাজউকের তালিকায় বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে একটি ২০২২, অন্যটি ২০০৮ সালে নির্মিত। হাজারীবাগের সালেহা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে নির্মিত আটতলা একটি ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। সাভারের আশুলিয়ায় দোসাইদ এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০১৭ সালে নির্মিত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক এনামুল হক সমকালকে বলেন, ‘রাজউক কোন দুটি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি। তবে আমরা বুয়েটের প্রকৌশলী এনে ভবন পরীক্ষা করলে তারা বলেছে, দুটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। পরবর্তী সময় ভবন দুটি ভূমিকম্প প্রতিরোধী করা হয়নি।’
রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন, ‘ঢাকা ও আশপাশের ভবন ন্যূনতম মান বজায় রাখা হচ্ছে না। এ কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুই লাখ ১০ হাজার থেকে তিন লাখ ১০ হাজার লোক মারা যেতে পারে। ক্ষয়ক্ষতি হবে ২৫ মিলিয়ন ডলারের মতো। যেসব ভবন রেট্রোফিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে, সেগুলোর জন্য খরচ করতে হবে ৬২ মিলিয়ন ডলার।’
এ ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জরিপ করে সংস্থাগুলোকে ভবন ভেঙে ফেলা ও রেট্রোফিটিংয়ের জন্য বলেছি। ৩১ ঘণ্টার মধ্যে চারবার ভূমিকম্প আমাদের বড় দুর্ঘটনার প্রস্তুতির সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এই সময় কেউ কাউকে দায় না চাপিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত মাঠে নামতে হবে।’
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নকশা না দেখালে সিলগালা
শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর নড়েচড়ে বসেছে রাজউক। রাজধানীর সব ভবন যাচাই করে ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করতে চাচ্ছে সংস্থাটি। ২৬টি অঞ্চলের (জোন) মধ্যে প্রথম পর্যায়ে দুর্বল ভবন পরখ করতে যাচ্ছেন পরিদর্শকরা। এদিকে ভূমিকম্পে পুরান ঢাকায় রেলিং ধসে পড়া ভবনটির নকশা সাত দিনের মধ্যে জমা না দিলে সেটি সিলগালা করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে রাজউক।
চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে রাজউকের শীর্ষ কর্মকর্তারা গতকাল পাঁচ এলাকার কয়েকটি ভবন পরিদর্শন করেন। ভূমিকম্পের পর এসব ভবন হেলে পড়ে ও কিছু অংশ ভেঙে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বংশালের কসাইটুলীতে যে ভবনের ছাদের রেলিং ভেঙে তিনজন নিহত হয়েছেন, সেই ভবনের মালিক এখনও লাপাত্তা। অন্য ভবন মালিকরাও তৎক্ষণাৎ নকশা দেখাতে পারেননি। পরে নকশা জমা দিতে তাদের এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়।
পরিদর্শক দলে থাকা এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কসাইটুলীর যে ভবনটির রেলিং ভেঙে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সেটি বেশ দুর্বল করে বানানো হয়েছিল। ফলে মাঝারি কম্পনেই সেটি ভেঙে পড়ে।
