ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয়ের মাস

দিল্লির স্বীকৃতিতে ঢাকায় উচ্ছ্বাস, চীনের নিন্দা

একাত্তরের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ চলে আসে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ওই সময় দেশি বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও বইয়ে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন।

দিল্লির স্বীকৃতিতে ঢাকায় উচ্ছ্বাস, চীনের নিন্দা
×

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৬ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৪:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দিল্লিতে সময় তখন সকাল সাড়ে ১০টা। ভারতের লোকসভার অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আসন থেকে উঠে দাঁড়ান ইন্দিরা গান্ধী। ঠিক তখনই পুরো কক্ষে শুরু হয় করতালি ও উল্লাস ধ্বনি। স্পিকারের আসনে বসা জিএস ধিলোনও টেবিল চাপড়াতে শুরু করেন। ইন্দিরা গান্ধী তখনও বক্তব্য দেওয়া শুরু করেননি।

লোকসভার ৬ ডিসেম্বরের ওই অধিবেশনে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বাংলাদেশকে। হিন্দুস্তান টাইমস ও আনন্দবাজার পত্রিকার সে সময়কার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শুরুতে একটি দীর্ঘ ভূমিকা দেন। লোকসভায় উপস্থিত অন্য সদস্যরা তখন অধীর হয়ে ওঠেন। এক সময় ইন্দিরা ঘোষণা দেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ ফের উল্লাস শুরু হয়। ভারতীয় লোকসভার সদস্যরা একযোগে স্লোগান দেন, ‘জয় বাংলাদেশ’।

খবরটি শুনেই কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশিরা আনন্দ মিছিল, স্লোগান ও নেচে-গেয়ে উদযাপন শুরু করেন। ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে আনন্দের বার্তা পৌঁছায় আরও কিছুক্ষণ পর। দুপুরে প্রচার হয় আকাশবাণীর খবরে। পত্রিকার পাতায় বিস্তারিত ছাপা হয় পরদিন ৭ ডিসেম্বর। 

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর কলকাতায় উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের পতাকা। ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে

জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিখেছেন, ‘দৈনিক ইত্তেফাকের খবরটায় একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন জাতি। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।’ ৬ ডিসেম্বরের খবরটি নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল– ‘পাক-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন’। অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তানের (এপিপি) বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনায় পাকিস্তান সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।’ 

তবে ভারতকে সেদিনই অভিনন্দন জানায় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানানো হয় রাশিয়া ও পোল্যান্ডকে (আনন্দবাজার, ৭ ডিসেম্বর)। ভারতের স্বীকৃতির আগের দিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। চীন এতে ভেটো দিলেও পক্ষে ভোট দিয়েছিল পোল্যান্ড। প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও পোল্যান্ডকে ধন্যবাদ জানানোর কারণ ছিল এটি।

ভারতের লোকসভার সদস্যদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী। ছবি: হিন্দুস্থান টাইমসের সৌজন্যে

চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের প্রায় ৪২ বছর পর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারত নয়, বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল ভুটান। ২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক জানান, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি তারবার্তার মাধ্যমে ভুটান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। 

চীনের প্রতিবাদ, রাশিয়ার দোটানা
নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান সংকট সমাধানের প্রস্তাব দিলেও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি দিতে চায়নি রাশিয়া। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান সে সময় রাশিয়াকে ভারতের পদক্ষেপ অনুসরণ না করার অনুরোধ করেছিল। মস্কো পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে ভারতকে সমর্থন দিলেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে রাওয়ালপিন্ডির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভাঙনের ঝুঁকি নিতে চায়নি। কারণ, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তখনও স্বাধীনভাবে পরিচালিত কোনো সরকার ছিল না।

১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: টাইমস আর্কাইভ/ ইলাস্ট্রেশন: সমকাল

অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারকে ভারতের স্বীকৃতি দেওয়ার নিন্দা জানায় চীন। তারা তখন এটিকে ভারতের ‘সম্প্রসারণবাদ’-এর উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দেয়। অভিযোগ করে, পূর্ব পাকিস্তান দখল করতে এই স্বীকৃতি ভারতের ষড়যন্ত্রের অংশ (নিউইয়র্ক টাইমস, ৭ ডিসেম্বর)।

বাংলাদেশে পঞ্চমুখী অভিযান 
৬ ডিসেম্বর রণাঙ্গনের ঘটনা নিয়ে যুগান্তরের প্রতিবেদনে লেখা হয়, বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় বাহিনী পঞ্চমুখী অভিযান চালাচ্ছে। ভারতীয় বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল এফ আর জ্যাকবের বরাত দিয়ে লেখা হয়, পূর্ব অঞ্চলে পাকিস্তানিদের তুলনায় ভারতীয় বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা খুবই কম। তবে কোনো কোনো জায়গায় পাকবাহিনী বীরত্বের সঙ্গে বাধা দিচ্ছে।

এপিপির বরাত দিয়ে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে লেখা হয়, সেদিন আখাউড়ায় পাকিস্তানিদের সঙ্গে সংঘর্ষে ৩০০ ভারতীয় সেনা হতাহত হন। ভারতের বিগ্রেড শক্তির আক্রমণ প্রতিহত করা হয়েছে। আর আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে লেখা হয়, যশোরে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থা বিপর্যস্ত। ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানিরা ক্রমেই পিছু হটছে। ফেনীর পতন হয়েছে। নানা পথে রংপুর ও দিনাজপুর শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় ও বীর মুক্তিবাহিনী। 

আরও পড়ুন

×