স্থবির ঢাকার দুই সিটির মশক নিধন কার্যক্রম
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১১ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবার শীত এলেই মশা কমতে থাকে। এবার মশার যন্ত্রণা থেকে যেন নিস্তার নেই। উল্টো মশার অত্যাচার আরও বেড়েছে। বিভিন্ন জরিপের তথ্যেও মশা বাড়ার চিত্র স্পষ্ট। তবে মশক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কার্যক্রম নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। এর মধ্যেও আশার কথা শোনাচ্ছেন মশক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যে এডিস মশা কমবে। ফলে ডেঙ্গু রোগীও কমে আসবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত লাখের কাছাকাছি। এ হিসাব শুধু রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর। এর বাইরেও বেসরকারি হাসপাতালে আক্রান্ত রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
মশার ঘনত্ব ও ধরন নিয়ে চার বছর ধরে জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহায়তায় এ কাজ চলছে। সর্বশেষ গত নভেম্বরের জরিপে মিরপুর, গুলশান, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২৫ ওয়ার্ডে মশার আনাগোনা বেশি দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি, ডিএনসিসির উদ্যোগে ব্র্যাক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত জরিপের তথ্য এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপের তথ্য থেকে দেখা গেছে, এডিস মশা কমেছে। তবে কিউলেক্স মশা বেড়েছে। এসব তথ্য নিয়ে ২৫টি ওয়ার্ডে ‘ক্লিন হোম সেফ লাইফ’ নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম।
কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার সমকালকে বলেন, আরও ১৫ দিন মশা বাড়তে থাকবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শীত শুরু হলে বৃষ্টি থেমে যায়। নর্দমার পানি পচতে থাকে। ড্রেন-খালে পানির প্রবাহ থাকে না। তখন মশার ডিম স্বভাবিকভাবে ফুটে যায়। এখন সে সময় চলছে। তবে সপ্তাহখানেকের মধ্যে এডিস মশা কমলেও কিউলেক্স মশার দৌরাত্ম্য আরও সপ্তাহ দুয়েক থাকবে।
নিধন কার্যক্রমে ভাটা
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর একযোগে মেয়র-কাউন্সিলর বরখাস্তের পর সংস্থার কার্যক্রমে যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল, তা এখনও কাটেনি। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বিভিন্ন সময় থাকছে ফাঁকা। ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে কার্যক্রম। ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সচিবের পদ শূন্য। ডিএসসিসিতে একের পর এক প্রশাসক বদল হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেও দায়িত্ব পালনে আছে নানা গাফিলতি। অনেকটা দায়সারাভাবে সবাই কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, আগে কাউন্সিলরের মাধ্যমে চলত মশক নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা কার্যক্রম। শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দিরে দেওয়া হতো সচেতনতামূলক বয়ান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী-শিক্ষককে সম্পৃক্ত করে চলত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি, লিফলেট বিতরণ। ভ্রাম্যমাণ
আদালতের অভিযানে জেল-জরিমানার মতো দণ্ডও দেওয়া হতো। গত এক বছরে এসব কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
জুরাইনবাসীর নাগরিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলনকারী মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, শীতে এত মশা জীবনেও দেখিনি। সারাদিনই মশার যন্ত্রণায় অস্থির থাকতে হচ্ছে। আর সন্ধ্যা হলেই ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার দিকে ফগার মেশিন দিয়ে মশার ওষুধ ছিটানোর দৃশ্য চোখে পড়লেও তাতে কাজ হয় না।
প্রায় একই কথা বলেন রোকেয়া সরণির পীরেরবাগ রোডের বাসিন্দা গুরুপদ সূত্রধর। তিনি বলেন, মশার অত্যাচারে কোথাও দাঁড়ানো যায় না।
মিরপুর এলাকার এক ওয়ার্ড সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, আগে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কার্যালয়ে মশার ওষুধ থাকত। প্রতিদিন আমাদের বরাদ্দ দেওয়া হতো। ফগারম্যানরা সকাল-বিকেল ওষুধ ছিটাচ্ছে কিনা দুই সিটি করপোরেশেনর ১৬৮ কাউন্সিলর সরাসরি তদারক করতেন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করে মশককর্মীরা ঠিকমতো ওষুধ ছিটায় কিনা সেটার তথ্য নেওয়া হতো। কাউন্সিলররা বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে এসব কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে।
কিউলেক্স মশার বিষয়টি স্বীকার করে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস সমকালকে বলেন, ইতোমধ্যে গুলশান-বনানী এলাকায় মশক নিধনের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে কয়েকটি লেক থাকায় মশার প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সপ্তাহখানেকের মধ্যে কার্যক্রম শুরু হবে।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিনও মশার দৌরাত্ম্য বাড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ঋতু পরিবর্তনের কারণে সপ্তাহখানেক হলো মশা বেড়েছে। তবে এটা ডেঙ্গু রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশা নয়, বেড়েছে কিউলেক্স। এ জন্য বিশেষ অভিযান না চালালেও ডিএসসিসি এ বিষয়ে কাজ করছে। শিগগিরই কিউলেক্স মশা কমে যাবে। এ ছাড়া মশার ওষুধের ঘাটতি নেই।
- বিষয় :
- সিটি করপোরেশন
- মশক নিধন
