বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে
ড. আহসান এইচ মনসুরের সাক্ষাৎকার
ড. আহসান এইচ মনসুর
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৩ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের নানা বিষয়ে সম্প্রতি সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ রনি
সমকাল: চলতি বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্যমাত্রা কেন পূরণ হলো না?
আহসান এইচ মনসুর: মূল্যস্ফীতি কমানোর আগের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আমরা আছি। তবে যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে পূরণ হয়নি। আমার বিশ্বাস, আগামী ফেব্রুয়ারিতে হবে। তবে আমরা চাইলে করা যেত। সময়মতো চাল আমদানি করলে এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে চলে আসত। চালে আমাদের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১৮ শতাংশ। সময়মতো নীতি গ্রহণ করতে না পারার কারণেও মূল্যস্ফীতি বাড়ে। পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টনের। সময়মতো আমদানির অনুমোদন না দিলে সরবরাহ ব্যাহত হয়ে দর বেড়ে যায়। বিশ্বাবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সমস্যা তৈরি হয়।
সমকাল: দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি নেই বলে বিভিন্ন পর্যালোচনায় বলা হচ্ছে। আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
আহসান এইচ মনসুর: শুধু নীতি দিয়ে বিনিয়োগ হয় না। সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিনিয়োগ আসে। আইনশৃঙ্খলাও একটি বিষয়। একটি পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ অবস্থান থাকে। ফলে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে আমরা কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে পেরেছি। বিনিময় হার স্থিতিশীল আছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে। বৈদেশিক লেনদেনে চলতি হিসাবের উন্নতি হয়েছে। খাদ্যশস্যেরও অভাব নেই।
সমকাল: দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক এক করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমানতকারীরা কোন প্রক্রিয়ায় টাকা ফেরত পাবেন?
আহসান এইচ মনসুর: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন হয়ে গেছে। এখন টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। টাকা কীভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে কারিগরি কাজ চলছে। মনে রাখতে হবে, এসব ব্যাংকে ৭৬ লাখ আমানতকারী। এখন প্রত্যেকের নামে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। তবে পাঁচটি ব্যাংকের আইটি সিস্টেম ইন্টিগ্রেটেড করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এখন পাঁচটি ব্যাংকের আইটি সিস্টেম থেকে ডুপ্লিকেট ফাইল নিয়ে আলাদা করা হচ্ছে। টাকা দেওয়া শুরু হবে। তবে লাইন ধরে টাকা দেওয়া হবে না। নতুন ব্যাংকে যার যার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়ে যাবে। যারা তুলতে চান, টাকা তুলতে পারবেন। আগের আমানত রাখতেও পারবেন। এটি নিয়েই এখন কাজ চলছে। কবে টাকা জমা হবে, তা জানিয়ে দেওয়া হবে। চলতি মাসের মধ্যেই যেন টাকা দেওয়া শুরু করা যায়, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো, পাঁচ ব্যাংকের বিদ্যমান ‘নস্ট্রো’ অ্যাকাউন্ট নতুন ব্যাংকের নামে রূপান্তর করা হবে। ফলে এসব ব্যাংক থেকে এলসি খোলা বা অন্য বৈদেশিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে কোনো সমস্যা হবে না।
সমকাল: সরকারি ব্যাংকসহ অন্যান্য দুর্বল ব্যাংকের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ কী হবে?
আহসান এইচ মনসুর: সব সরকারি ব্যাংকের অবস্থা কিন্তু খারাপ নয়। সরকারি ব্যাংকের বিষয়ে সরকার ভাবছে। এখন থেকে যে কোনো ব্যাংক খারাপের দিকে গেলে আগে থেকেই সাবধান করা হবে। এরপরও যদি সূচকের উন্নতি না হয়, তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় আনা হবে। আগে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ ছিল না। আইন করার ফলে এখন ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। আমানত বীমা তহবিলে এখন ব্যাংকের প্রতি একশ টাকা আমানতের বিপরীতে ৭ পয়সা দিতে হয়। এখন থেকে রেজল্যুশন তহবিলেও টাকা দিতে হবে।
সমকাল: বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রমাগত ডলার কিনছে? এর কারণ কী?
আহসান এইচ মনসুর: আমরা অনেক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি যখন গভর্নর হিসেবে যোগদান করি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিনিময়হার ছিল প্রতি ডলার ৮৩ রুপি। এখন যা ৯০ রুপি হয়েছে। ওই সময়ে ডলারের দর ১২০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১২২ টাকা হয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো– আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে রিজার্ভ বাড়বে না। তারা হয়তো এক-দুই বিলিয়ন ঋণ দেবে। আগের ঋণ পরিশোধ করতেই যা শেষ হয়ে যাবে। ফলে রিজার্ভ বাড়াতে হবে আমাদের মতো করেই। গত কয়েক মাসে রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন বেড়ে এখন ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়নে নিতে হবে। বাজার থেকে না কিনলে রিজার্ভ বাড়বে কীভাবে? আমাদের রিজার্ভ আমাদের অর্থনীতি থেকেই আসতে হবে। ডলার কেনার বিষয়টি একটি রুটিন ওয়ার্ক। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এক ডলারও বিক্রি করিনি।
সমকাল: পাচার অর্থ ফেরতের বিষয়ে অগ্রগতি কেমন?
আহসান এইচ মনসুর: অর্থ ফেরত আসার বিষয়টি চার-পাঁচ বছরের সময়সাপেক্ষ। তবে আমরা দুই উপায়ে অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করছি। সরকারিভাবে এবং বিদেশি আইনি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে। এক্ষেত্রে প্রতিটি বড় গ্রুপের জন্য একটি করে লিড ব্যাংক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন অর্থ পাচারকারী যে ব্যাংকে বেশি ঋণ ওই ব্যাংককে লিড ব্যাংক নির্বাচন করে বিদেশি ল’ ফার্মকে যে কোনো বিষয়ে তথ্যের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সমকাল: বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন এই সরকারের সময়ে আদেশ আকারে জারি করা হবে?
আহসান এইচ মনসুর: এটি সরকারের সুশাসনের ইস্যু। আমরা অপেক্ষায় আছি। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ও ব্যাংক কোম্পানি আইনে কোথায় কী সংশোধন দরকার সরকারের কাছে প্রস্তাব আকারে দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকারের সময়েই এর বাস্তবায়ন হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়টি এখন আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে।
সমকাল: ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি ব্যবস্থা জোরদারে নতুন কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
আহসান এইচ মনসুর: ব্যাংকগুলোর ওপর ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা আগামী ১ জানুয়ারি থেকেই চালু হবে। এটি পেছানোর কোনো কারণ নেই। এরই মধ্যে আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ৬১টি ব্যাংকের সঙ্গেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে। এখানে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের দরকার আছে। আবার স্বাভাবিক যে পরিদর্শন রয়েছে, তার মাধ্যমে কাজ করা হবে। নতুন বিভাগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে ৫শ লোককে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। শতভাগ কাভারেজ নিয়েই আগামী ১ তারিখ থেকে ‘আরবিএস’ শুরু হবে।
- বিষয় :
- ড. আহসান এইচ মনসুর
- গভর্নর
- বাংলাদেশ ব্যাংক
