ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এএলআরডি-সমকাল গোলটেবিল বৈঠক

কৃষকের উন্নয়নে ভূমি ও কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন জরুরি

কৃষকের উন্নয়নে ভূমি ও কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন জরুরি
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ভূমিতে অধিকার ও দারিদ্র্য নিরসন: নীতি ও আইনের সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিরা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। এ জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমির সুষ্ঠু বণ্টন প্রয়োজন। সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসী, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার প্রান্তিক মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী কৃষকের ন্যায্য মজুরি ও প্রণোদনা দেওয়া দরকার। এ জন্য স্থায়ী জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে ভূমির নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া উচিত।

গতকাল বৃহস্পতিবার সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘ভূমিতে অধিকার ও দারিদ্র্য নিরসন: নীতি ও আইনের সংস্কার’ শিরোনামে এ আলোচনার আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও দৈনিক সমকাল। এতে বক্তারা অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নতুন সরকারের উদ্দেশে ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত ভূমি। এ খাতে স্বচ্ছতা আনতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। 

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা সম্পদের হিসাব দেবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। তারা যদি তা করতেন, তাহলে তাদের বিদায় পর্যন্ত একটি চিত্র দেশবাসী পেত। সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা হলফনামা দিচ্ছেন। তাহলে আমলারা নিজেদের হিসাব কেন দেবেন না? দুর্নীতির প্রতিকারের জন্য আইন আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। 

ভূমির নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা এক জায়গায় এনে একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে সব দায়িত্ব ভূমি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া উচিত বলে মত দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, চব্বিশের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। সরকার সেই জায়গা থেকে সরে এসেছে। নারীদের প্রান্তিক পর্যায়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সরকার নারীবিদ্বেষীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। উগ্রবাদী শক্তির সঙ্গে মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি একাকার হয়ে গেছে। অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম– এই তিনটি এখন পুঁজি ও ক্ষমতার উৎস। 

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমীন বলেন, আলোচনায় যেসব প্রস্তাব-পরামর্শ এসেছে, তার কোনোটির সঙ্গে বিএনপির দ্বিমত নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রে বৃহত্তর পরিসরে আলাপ করবে বিএনপি। তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে নিশ্চয়ই দাবিগুলো নিয়ে কাজ করবে। 

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, দেশের ৮০ শতাংশ জনগণ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। করোনার সময় সব বন্ধ থেকেছে। কিন্তু কৃষক ঠিকই মাঠে গেছে। তাই ভূমি ও কৃষকের উন্নয়নের দাবিগুলো বাস্তবায়নে রাজনীতিবিদদের চালকের আসনে থেকে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। 
মূল প্রবন্ধে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, কৃষিশুমারি ২০১৯ অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। এদের ৯১.৭ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। তারা ২ কোটি ৫৮ লাখ একর জমিতে বিভিন্ন ফসল ফলায়। যদিও গ্রামীণ কৃষিনির্ভর জনসংখ্যার ৫৬ ভাগই ভূমিহীন। গত তিন দশকে সরকারি-বেসরকারি উৎস থেকে দেওয়া ঋণ সহায়তা বা ভর্তুকি শতকরা ২৪ ভাগের কম পেয়েছেন কৃষকরা। 

শামসুল হুদা জাতীয় ভূমি-কৃষি সংস্কার ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিশন গঠন, ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, বর্গাচাষির অধিকার সুরক্ষা, খাসজমি বন্দোবস্ত ও ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভূমি অধিকার, ভূমিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক সংস্কার, দেশীয় উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণসহ ২১টি সুপারিশ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সমতলের আদিবাসীরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যায় জর্জরিত। মধুপুরে ২০ হাজার গারো আদিবাসী আছেন। তারা কৃষিকাজ করছেন। তাদের ঘরবাড়ি আছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে; কিন্তু জমির দলিল নেই। সিলেটেও একই রকম আছে। কিন্তু সরকার একেক সময় এসব জমিকে রিজার্ভ ফরেস্ট, ইকোপার্ক ঘোষণা দেয়। 
তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, আদিবাসীদের জন্য একটি ভূমি কমিশন করা হোক। অন্তত তাদের সরকারিভাবে একটি চিঠি দেওয়া হোক, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যে জমিতে তারা বসবাস করে, ওই জমি তাদেরই থাকবে। 

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফেরদৌসী সুলতানা বেগম বলেন, নারীদের ১৫টি ইস্যু নিয়ে কমিশনে কাজ করেছিলাম। নারী শিক্ষা, উত্তরাধিকার, খাসজমি, চা বাগান শ্রমিক ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছিলাম। সম্পত্তিতে নারীদের নাম না থাকার কারণে একতরফা ভূমি ব্যবস্থাপনা হচ্ছে। তারা সরকারের দেওয়া সার-বীজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ কৃষিতে নারীরা সবচেয়ে বেশি কাজ করেন। 
ফেরদৌসী সুলতানা বেগম বলেন, ২০-২৫ বছর সংসার করার পরও নারী তালাকপ্রাপ্ত বা বিচ্ছিন্ন হন। তখন তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। তাঁকে আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, অন্তত উত্তরাধিকার আইনটি বাস্তবায়ন করা হোক।
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে। কিন্তু সেই কৃষকদের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র ধারণ করেনি। আমাদের চিহ্নিত করতে হবে, ভূমি কেন সংকটাপন্ন হয়েছে। 

আইনে কৃষিজমি শব্দটা উল্লেখ থাকা, ভূমির প্রাকৃতিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া, ভূমির জীবন্ত সত্তাকে স্বীকার করা, জাতীয় ভূমি মানচিত্র করা, ভূমির লাল তালিকা করা, ভূমির সঙ্গে জলবায়ুকে যুক্ত করা এবং গবাদি প্রাণীর জন্য চারণভূমি সংরক্ষণের প্রস্তাব করেন তিনি। 

বৈঠকের সভাপতি ও ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় জটিলতা আছে, দুর্নীতি আছে। নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার। আদিবাসী কৃষকরাও বঞ্চিত। এসব দিকে নীতিনির্ধারকদের সার্বিকভাবে দৃষ্টি থাকে না। আইন-নীতিমালা সরকারের দিক থেকে সঠিকভাবে না এলে দারিদ্র্য নিরসন, উন্নতি সম্ভব হবে না। 
খুশী কবির বিশেষ করে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারের প্রতি জোর দেন। তিনি বলেন, কৃষির গুরুত্ব, ভূমির অধিকার ও দারিদ্র্য নিরসনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা থাকতে হবে। 
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা, হেডম্যান কার্বারি নেটওয়ার্কের (রাঙামাটি) সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা, মানবমুক্তি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ বাহার, অন্য চিত্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা প্রমুখ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
 

আরও পড়ুন

×