ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংসদ নির্বাচন

প্রচার শেষ, ভোটের অপেক্ষা

প্রচারণা করলে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে ইসি

প্রচার শেষ, ভোটের অপেক্ষা
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০২ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে শেষ হলো আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে আর কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ প্রচারণা চালাতে পারবেন না। কেউ প্রচারণা চালাচ্ছেন– এমন প্রমাণ মিললে ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করে দিতে পারবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলবে। ৩০০ আসনের তপশিল ঘোষণা হলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ২৯৯ আসনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে। 

জনসভা আয়োজনে ৯৬ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা: এদিকে, ভোটের আগে-পরের ৯৬ ঘণ্টা সারাদেশে জনসভা আয়োজন বা অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে, চলবে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। এ ছাড়া ভোট গ্রহণ শুরু থেকে পরবর্তী সাড়ে ৮১ ঘণ্টা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা ও অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া বহিরাগতরা ওই এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না। এ ছাড়া মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর ৭২ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে। 

গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের তপশিল ঘোষণা করেছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এর আগে গত ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ শেষে ২২ জানুয়ারি (২১ জানুয়ারি রাত ১২টা) থেকে ১৯ দিনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামার সুযোগ পান সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা। 
এবারের নির্বাচনে ইসির নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি অংশ নিচ্ছে। মোট প্রার্থী ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে দলীয় ১ হাজার ৭৬৮ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৬ জন। তবে স্থগিত হওয়া শেরপুর-৩ আসন বাদে ২৯৯ আসনে প্রার্থী রয়েছেন ২ হাজার ২৯ জন। ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১; নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৪ এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ১ হাজার ১২০ জন। 

এবারই প্রথমবারের মতো আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। বিশ্বের ১২২ দেশের প্রবাসী বাংলাদেশি ছাড়াও দেশের ভেতরে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে থাকা কারাবন্দিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ এবং দেশের অভ্যন্তরে আইসিপিভি ভোটার ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন। ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৭ হাজার ৭০৫ প্রবাসী এবং দেশের ভেতরে অবস্থিত ৪ লাখ ৭৩ হাজার ১৪৪ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। 

ইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৭৯টি। ভোট কক্ষের (বুথ) সংখ্যা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। গড়ে প্রতি ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটি করে কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। 

আর নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করছেন ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ভোট গ্রহণের জন্য ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
পর্যবেক্ষক প্রসঙ্গে ইসি জানায়, ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে পর্যবেক্ষণে থাকবেন। এ ছাড়া প্রায় ৫০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষকও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।

প্রচারণায় উৎসবমুখর ছিল গোটা দেশ
গত ১৯ দিনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণাকালে দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সূচনা হয়েছিল। গণসংযোগের পাশাপাশি মিছিল, সভা-সমাবেশ ও জনসভা করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা। সেই সঙ্গে ছিল মাইকিংও। তবে এবার প্রথমবারের মতো পোস্টারহীন প্রচারণা চালানোয় ভোটের চিরাচরিত আমেজের কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয়। সেই ঘাটতির কিছুটা পূরণ হয়েছে প্রার্থীদের সমর্থনে টানানো বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুনে। 

প্রচারণায় এগিয়ে ছিল প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দল। বিশেষ করে বিএনপি জোট এবং জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রচারণা ছিল জমজমাট। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রচারণাকালে দেশের ২১ জেলায় ৪৪টি জনসভা ও পথসভায় যোগ দেন। আর জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর জোট ও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ৫৫ জেলার শতাধিক জনসভা ও পথসভায় অংশ নিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বামপন্থিদের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট এবং জামায়াত জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য দল ও জোটের প্রার্থীরাও প্রচার-প্রচারণায় নেমেছিলেন। 

আচরণবিধি লঙ্ঘন
ইসি জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হওয়ায় প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে পারবেন। কিন্তু ভোট চাইতে পারবেন না। সেটা করলে আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন তথা নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম হিসেবে গণ্য করা হবে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে জরিমানার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রাখে।
তবে প্রচারণা শুরুর আগে-পরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়েছিল সারাদেশেই। ইসির হিসাবে গত ৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাসজুড়ে অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আচরণবিধি লঙ্ঘনের মোট ৪৬১টি ঘটনা চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে ২৫৯টি ঘটনায় সরাসরি মামলা দায়ের করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব মামলায় জরিমানা হিসেবে আদায় করা হয়েছে ৩২ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০ টাকা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ ৩৩টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। ওই দিন ১৩টি মামলার বিপরীতে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ সব দলের বিরুদ্ধেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। 

সংঘাত-সহিংসতাও কম ছিল না 
নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনাও ছিল অনেক বেশি। তপশিল ঘোষণার পর থেকে সারাদেশে এমন ২৭৪টি সহিংসতা ঘটে। যেখানে সরকারি হিসাবে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। অবশ্য গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে নির্বাচনী সহিংসতায় মৃত্যু ঘটেছে ১৫ জনের। 

৯৬ ঘণ্টা সভা-সমাবেশ নয়
ইসি জানিয়েছে, ভোট গ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা এবং ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় কোনো ব্যক্তি জনসভা আহ্বান, অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান এবং কোনো মিছিল বা শোভাযাত্রা করতে পারবে না। এই নিষেধাজ্ঞা মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। কোনো ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি আরপিও অনুযায়ী অন্যূন ২ বছর এবং অনধিক ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বলেও ইসি সতর্ক করেছে। 

বহিরাগত অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা
সোমবার ইসি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে ভোট গ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোট শেষের ২৪ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বহিরাগতরা নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না। নির্বাচনী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ও নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন। 

যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা 
ভোটগ্রহণের দিন এবং তার আগে-পরে কিছু যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

এ ছাড়া ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের মধ্যরাত অর্থাৎ বুধবার রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ও অনুমতিপ্রাপ্ত সাংবাদিক-পর্যবেক্ষক এবং জরুরি সেবাকাজে নিয়োজিত যানবাহন ও ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অনুরূপ কাজে ব্যবহৃত দ্রব্য ও সংবাদপত্র বহনকারী সব ধরনের যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। এ ছাড়া আত্মীয়স্বজনের জন্য বিমানবন্দরগামী (টিকিট বা অনুরূপ প্রমাণ) এবং দূরপাল্লার যাত্রী বহনকারী অথবা দূরপাল্লার যাত্রী হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের জন্য যে কোনো যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×