ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অমর একুশে পালিত

গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার অঙ্গীকার

গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার অঙ্গীকার
×

ভাষার জন্য অনন্য আত্মত্যাগের দিন একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে প্রথম প্রহর থেকেই নামে সর্বস্তরের মানুষের ঢল। পরে শিক্ষার্থীরা সেই ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন শহীদ মিনার। গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহ

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার পালিত হয়েছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে প্রথম শহীদ দিবস ছিল এটি। দিনটিতে হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধায় ভাষাশহীদদের স্মরণ করেছে জাতি। পাশাপাশি দেশজুড়ে আয়োজিত প্রতিটি কর্মসূচিতে লাখো মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে শহীদের স্বপ্নের বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তোলার দৃপ্ত শপথ। 

এদিন ভোরের আলো ফুটতেই মানুষ পথে নেমেছিল একুশের শহীদদের প্রতি প্রাণের অর্ঘ্য নিবেদনে। নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরি করে সারাদেশের শহীদ মিনার অভিমুখে ছুটেছে সবাই। ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছে স্মৃতির মিনার। তাদের কণ্ঠে ছিল অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।’

এর আগে একুশের প্রথম প্রহরে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। পরে রাত ১২টা ৮ মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ভাষাশহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করেন প্রধানমন্ত্রী। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরে মন্ত্রিসভার সদস্যরা ছাড়াও স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বিএনপির পক্ষ থেকেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। 

এ সময় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশি মিশনপ্রধান, পুলিশের আইজি, অ্যাটর্নি জেনারেল, ডিএমপি কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরাও শ্রদ্ধা জানান। 

সাম্প্রতিক সময়ে প্রথম মোনাজাত  
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রথমবারের মতো পুষ্পস্তবক অর্পণের পর হাত তুলে মোনাজাত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে অন্য সবাই মোনাজাতে অংশ নেন।

জানতে চাইলে অমর একুশে উদযাপন কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক আবদুস সালাম সমকালকে বলেন, মোনাজাতের বিষয়টি সব পক্ষের সমর্থনে এবারই প্রথম সংযোজিত হয়েছে। একটি পর্যায় পেরিয়ে এবার আমরা একটি ভালো আয়োজন করতে পেরেছি। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। 

প্রথমবারের মতো জামায়াত আমিরের শ্রদ্ধা নিবেদন 
একুশের প্রথম প্রহরে প্রথমবারের মতো রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জামায়াত আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা।  

উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মুজিবুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহসহ অন্য নেতারা। ফুল দেওয়ার পর শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ভাষাশহীদদের জন্য তারাও দোয়া এবং মোনাজাত করেন।

শহীদ মিনার ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন জামায়াত আমির। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে ফুল দেওয়াটা বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব। এই কারণে সঙ্গীদের নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসেছি। 

এখনও কি জামায়াতে ইসলামী শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে ‘নাজায়েজ’ মনে করে– একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে মৃদু রাগে শফিকুর রহমান পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘এ ধরনের প্রশ্ন আপনি কেন আজকে করছেন?’ পরে তিনি নেতাদের নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরে দোয়া ও মোনাজাত করেন।

জাপার ব্যানার-ফুল কেড়ে নেওয়া হলো 
একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের আনা ব্যানার ও ফুল কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। শুক্রবার রাত ২টার দিকে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান ও বাধার মুখে তারা শ্রদ্ধা নিবেদন না করেই এলাকা ত্যাগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে থাকা এনসিপির মহানগর নেতাকর্মীরা এই বাধা দিয়েছেন। তবে জাতীয় পার্টির এই শ্রদ্ধা নিবেদনে দলের প্রথম সারির কোনো নেতাকে দেখা যায়নি।

ফুলে ফুলে ভরে গেল শহীদ বেদি
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এলাকা ত্যাগ করলে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার খুলে দেওয়া হয়। গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানান। 

শনিবার ভোর থেকেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের জন্য আসা মানুষের ঢল নামে। প্রভাতফেরি ও শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে অংশ নেন ঢাকাসহ সারাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ সব বয়সী নারী-পুরুষ। কেউ পরিবার, কেউ বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এসেছিলেন। কেউ আসেন শোকের রং কালো পাঞ্জাবি পরে; কেউ হাতে ফুল নিয়ে, কেউ বা মাথায় বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে। লাল পাড়ের শাড়ি আর লাল-রঙা পাঞ্জাবি, শিশুদের গালে ‘অ আ ক খ’ আঁকা ভিন্ন আবহ তৈরি করে। শহীদ মিনারে অভিভাবকদের দেখা যায় হাত ধরে নিয়ে আসা সন্তানের কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের সারি আরও দীর্ঘ হয়। দুপুর পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব চলেছে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ মিনারের বেদি।  ভোরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা। 

সকালে বিএনপির পক্ষে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, মহিলা দল, যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতী দল, জাসাসসহ বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।  

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবদুস সালাম বলেন, ১৭ বছরের কঠিন লড়াই ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। একুশের চেতনা ধারণ করে সবাইকে আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। 

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে দলটির নেতারা শ্রদ্ধা জানান। পরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ভাষাশহীদদের আদর্শ ধারণ করে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার লড়াই অব্যাহত থাকবে। আগামী দিনে ভাষা আন্দোলন, একাত্তর ও চব্বিশের আন্দোলনের শহীদদের ত্যাগ সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, বহুত্ববাদী এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দক্ষতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি একুশের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। একুশের মূল শিক্ষা হচ্ছে– সকলের সমান মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। সবাইকে দুর্নীতি রুখে দিয়ে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একুশের চেতনার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। এ ছাড়াও একুশের প্রথম প্রহর ও শুক্রবার দিনভর আরও শ্রদ্ধা জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

আরও আয়োজন
দিনটি উপলক্ষে শনিবার ভোরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর বিভিন্ন সড়ক, সড়কদ্বীপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান বাংলাসহ সকল জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা-সংবলিত ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়।

আরও পড়ুন

×