ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের তল্লাশি-মারধর নিয়ে প্রশ্ন

ডিসি মাসুদসহ পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার ও বিচার দাবি

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের তল্লাশি-মারধর নিয়ে প্রশ্ন
×

সোমবার রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীদের মারধর করে পুলিশ

সমকাল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০২:৪৫

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীদের মারধরের ঘটনায় পুলিশের পেশাদারিত্ব ও আইনি এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার রাতে তল্লাশির নামে হয়রানি ও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া নাগরিকদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ।

অভিযানের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে একাধিক মানবাধিকার সংগঠন। তারা বলছে, বাংলাদেশের কোনো আইনেই পুলিশকে সন্দেহভাজন, আটক ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে মারধর বা শারীরিক নির্যাতন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

মাদকবিরোধী অভিযানের সময় সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলা ও মারধরের ঘটনায় গতকাল নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ও বিপ্লবী যুব আন্দোলনের নেতা নাইম উদ্দীনসহ কয়েকজনের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে থানায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। 

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শাহবাগ থানার সামনে ঘেরাও করে তারা বিক্ষোভ করেন। ঢাবির শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীদের মারধরের ঘটনায় পুলিশের চার সদস্যেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গত সোমবার রাত ৮টায় পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অভিযান চালান। এ সময় সংবাদকর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুলিশ মাদকসেবীদের পাশাপাশি ঢাবির শিক্ষার্থী ও দুজন সংবাদকর্মীকে বেধড়ক মারধর করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তল্লাশির সময় নাগরিকেরও কিছু আইনি অধিকার আছে। পুলিশের কাছে তার পরিচয়পত্র দেখতে চাইতে পারেন। সিভিল পোশাকে থাকলে তিনি পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য। পুলিশ যদি কারও কাছ থেকে কিছু উদ্ধার করে (যেমন– মোবাইল বা মানিব্যাগ), তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি জব্দ তালিকা বুঝে নেওয়ার অধিকার নাগরিকের রয়েছে।

সোমবার রাতের পুলিশের হামলায় অনলাইন পোর্টাল বাংলানিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদ ও আজকের পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার কাওসার আহম্মেদ রিপন আহত হন। তারা নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও পেটানো হয়। আহত তোফায়েলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীদের মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এ ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।

হামলার শিকার সংবাদকর্মী রিপন সমকালকে বলেন, অভিযান শুরু করার আগে এসআই আলামিন বারবার কনস্টেবলদের বলে দিয়েছিলেন, তোমরা মাদকসেবীদের না মেরে সাংবাদিকদের আবার মারতে যেও না।

তারপরও কনস্টেবলরা সাংবাদিকদের ওপর লাঠিচার্জ করেন। সহকর্মী তোফায়েলের ওপর হামলা হতে দেখে তিনি দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করেন, সাংবাদিকদের কেন মারছেন? কোনো জবাব না দিয়ে তাঁকেও মারধর শুরু করে।
এদিকে ডিসি মাসুদ আলম ও কনস্টেবলদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। এই দাবিতে গতকাল দুপুরে শাহবাগ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন তারা।

বিক্ষোভকারীরা ‘হারুন গেছে যে পথে, মাসুদ যাবে সে পথে’, ‘আমার ভাইকে মারল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘শাহবাগ থানা জবাব চাই, আমার ভাইকে মারল কেন’, ‘মাসুদের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’সহ নানা স্লোগান দেন।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, সোমবার রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’র সময় দুই সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী নাইম উদ্দীনসহ কয়েকজন মারধরের শিকার হন।

ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের ঢাকা মহানগর ইউনিটের আহ্বায়ক নাঈম উদ্দীনের ওপর পুলিশের মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ডিসি মাসুদ আলমের সঙ্গে কথা বলার সময় পেছন থেকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে মারধর করেন একাধিক পুলিশ সদস্য।

বিক্ষোভে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কাফিরা জাহান বলেন, পুলিশসহ যে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্ন করতে পারা নাগরিক অধিকার। দীর্ঘদিন ধরে এই অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নাঈমের ওপর হামলা পুলিশের ইগোভিত্তিক সহিংসতার অংশ। তিনি দাবি করেন, নাঈম উদ্যানে হাঁটছিলেন এবং তাঁর কাছে কিছু না পাওয়ার পরও তাঁকে মারধর করা হয়েছে। এর জবাবদিহি চেয়ে তিনি ডিসি মাসুদ ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিচারের দাবি জানান।

বিক্ষোভ শেষে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ হেল বুবুন তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ডিসি মাসুদসহ হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, ক্যাম্পাস এলাকার ভেতরে ও বাইরে শিক্ষার্থীদের ওপর সব ধরনের পুলিশি হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ঘটনার বিষয়ে নাঈম উদ্দীন জানান, তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছিলেন এবং ফেরার পথে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো অবৈধ কিছু না পাওয়ার পরও তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। তার মাথা, হাত ও পায়ে আঘাত লেগেছে। সঙ্গে থাকা আরেক বন্ধুকেও মারধর করা হয়েছে।

এদিকে একই ঘটনার প্রতিবাদে দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক। তিনি বলেন, বাস্তবে শুধু পোশাক পরিবর্তন ছাড়া পুলিশের আর কোনো দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি। পুলিশ আগেও সাধারণ জনগণের সঙ্গে যে অন্যায় আচরণ করত, এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় পুলিশ ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার জরুরি। মানববন্ধন থেকে নাঈম উদ্দীনের ওপর হামলার ঘটনায় ডিসি মাসুদের অপসারণ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার দাবি জানানো হয়।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারা পর্যন্ত পুলিশের গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে যতটুকু বল প্রয়োগ প্রয়োজন (যদি সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে), তার বেশি শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ, আটক করার পর বা আয়ত্তে আসার পর তাকে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুসারে– পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে ওয়ারেন্ট বা পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে, যদি তাঁর বিরুদ্ধে যৌক্তিক সন্দেহ থাকে যে, তিনি কোনো অপরাধ করেছেন বা করতে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের আগে বা পরে তল্লাশি করতে হলে তা যুক্তিসংগত সন্দেহের ভিত্তিতে করতে হবে।

অন্যদিকে, ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী, কোনো স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বা তথ্য বের করার জন্য পুলিশ কোনোভাবেই শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না।

পুলিশ কেবল তখনই লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ করতে পারে, যখন জননিরাপত্তা চরম হুমকিতে থাকে। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা সেই ধরনের ছিল না।  বাংলাদেশের সংবিধানও প্রতিটি নাগরিককে নিষ্ঠুরতা থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩৫(৫)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না বা তাহার সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।’

শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে ১৬ জনকে আটক করা হয়। মঙ্গলবার তাদের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম সমকালকে বলেন, অভিযানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। অভিযানের সময় সাংবাদিক আগেই মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে যায়। মাদকসেবীদের আটক করার সময় ওই সাংবাদিকদের পুলিশ চিনতে পারেনি। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের প্রত্যাহার করে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

×