ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া, নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ

ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া, নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ
×

 মুকিত রহমানী, সিলেট, তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ 

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ঘুরতে গিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি ছিনতাইকারীদের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন (২৬)। দুদিন পর গত শুক্রবার রাতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত শনিবার বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করে খুনিদের গ্রেপ্তারে আলটিমেটাম দেন।

এর আগে গত ২৩ অক্টোবর দিঘারকান্দা-রহমতপুর বাইপাস সড়কে মাছুম নামে বাক্প্রতিবন্ধী অটোরিকশা চালককে পিঠে ও গলায় ছুরিকাঘাত করে যানটি ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ জেলায় ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অন্তত ২০টি ঘটনা ছিনতাই-সংশ্লিষ্ট।

সূত্র জানায়, নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজারেরও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। শুধু কোতোয়ালি থানায় প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০টি অভিযোগ জমা পড়ে। তবে আইনি জটিলতা, পুলিশের প্রতি অনাস্থা ও সামাজিক হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগীর বড় অংশ থানায় অভিযোগ করেন না। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০টি; গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৬৭ জন। তবে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ময়মনসিংহ নগরীতে প্রতি মাসে এক হাজারেরও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। জটিলতা ও নিরাপত্তা শঙ্কায় বেশিরভাগ ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেন না। 
নগরীর মীরবাড়ি এলাকার শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সজীব জানান, গত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি চারবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি কলেজ রোড এলাকায় একদল ছিনতাইকারী তাঁর মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। টাঙ্গাইল পলিটেকনিকের ছাত্র রুবেল আহমেদ স্বাধীন জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর চলন্ত অটোরিকশায় যাত্রীবেশে ওঠা ছিনতাইকারীরা তাঁর গলায় চাকু ধরে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। 

ধোবাউড়া উপজেলার আবু রায়হান জয়নাল আবেদীন পার্কে ঘুরতে এসেও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। জীবন বাঁচাতে চিৎকার করলে অপরাধীরা তাঁর দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে তারা কেউই এসব ঘটনায় থানায় যোগাযোগ করেননি।

নগরীর শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, বাকৃবি শেষ মোড়, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, কলেজ রোড, মাদ্রাসা কোয়ার্টার, কাশর রোড, বাইপাস মোড়, গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, বাঘমারা, চরপাড়া, মাসকান্দা এবং জয়নুল আবেদিন পার্ক এলাকাগুলোকে ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এখন কেবল নির্জন স্থানেই নয়, বরং প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে অটোরিকশার ভেতরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আশপাশে থাকা যাত্রীরাও ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। জেলার আশপাশ থেকে আসা কয়েক লাখ শিক্ষার্থী এখন ছিনতাইকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছর ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটক ৪৬৭ আসামির মধ্যে ৩৬২ জনই নগরীর স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ি– এ চার এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালে এসব এলাকার ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে ৪৫টি মামলা হয়েছে। আটক হয় অন্তত ৩০০ পেশাদার ছিনতাইকারী। তারা জেল থেকে বের হয়ে আবারও ছিনতাইয়ের একই কাজে লিপ্ত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর সানকিপাড়ার এক ছিনতাইকারী বলেন, তিনি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। সর্বশেষ ১৬ দিন জেলে থেকে তিনি জামিন পান। তার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতেই তিনি ছিনতাই করেন। মোবাইল নিলে সহজেই পুলিশের হাতে আটক হতে হয় বলে অধিকাংশ ছিনতাইকারী কৌশল বদলেছে।

সিলেট নগরীতে বেড়েছে চুরি-ছিনতাই 
সিলেট নগরীতে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। অধিকাংশ ঘটনায় আইনের আশ্রয় নেন না ভুক্তভোগীরা। নির্বাচনের আগে-পরে অন্তত ছয় থেকে আটটি ঘটনা ঘটে। 
গত মঙ্গলবার বিকেলে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকার গলিতে নিজ বাসার পাশেই ছিনতাইয়ের শিকার হন সিলেট কর অফিসের পরিদর্শক ইয়াছমিন আক্তার। তিনি অফিস শেষে ব্যাংক থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফিরছিলেন। তিনটি মোটরসাইকেলে ছয় ছিনতাইকারী অটোরিকশা থামিয়ে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৭ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে নগরীতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ইয়াছমিন আক্তার পুলিশকে জানান, তাঁর ব্যাগে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিল। তিনি ব্যাংকে গিয়েছিলেন। তবে তিনি মামলা করেননি।
এর আগে গত ১২ জানুয়ারি সকালে ছিনতাইয়ের শিকার হন এক নারী। তাঁর ভাই এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। গত শনিবার সুবিদবাজার মোড়ের আলী সেন্টারে এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সাইকেল চুরি হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকা থেকে ফেরার পর সুরমার কিনব্রিজ পার হয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন মামুন রশিদ নামে ব্যবসায়ী। তিনি নগরীর শাহি ঈদগাহের বাসিন্দা। তিনি থানায় অভিযোগ করেননি। 

কেন থামছে না?
অপরাধ না কমার কারণ হিসেবে আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন অনেকে। ময়মনসিংহ জজকোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন সমকালকে জানান, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৯২, ৩৭৯ ধারায় ছিনতাইয়ের মামলা করা হয়। এ ধরনের ঘটনার জন্য দেশের প্রচলিত আইন ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার অভাব অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তিনি জানান, দীর্ঘসূত্রতা ছিনতাই দমন করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ। 

ময়মনসিংহের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, পুলিশের টহল কেবল প্রধান সড়কে সীমাবদ্ধ থাকায় অপরাধীরা অলিগলি ও অন্ধকার মোড়গুলোকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। গ্রেপ্তার ছিনতাইকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই মাদকাসক্ত হওয়ায় মাদকের উৎসস্থল বন্ধ করাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

উত্তরণে নাগরিকদের পরামর্শ
ময়মনসিংহের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নগরীর অন্তত ২০ ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। ছিনতাই রোধে তারা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছেন। তারা অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিভিল পোশাকে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, জেলা পুলিশের শক্তিশালী আইটি উইংয়ের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের আইএমইআই ট্র্যাকিং জোরদার করা, প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘বিট পুলিশিং’ সক্রিয় করা এবং প্রতিটি মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও লাইভ মনিটরিং নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। ছিনতাই পণ্য কেনা অসাধু দোকানদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন।
তাদের দাবি, জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও ন্যূনতম সাজা বাড়াতে হবে। তারা যাতে সহজে জামিন না পায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। অসাধু আইনজীবীদের বয়কট করতে হবে।
 

আরও পড়ুন

×