লজ্জা-ভয়ে চাপা দেওয়া হয় নিপীড়নের অধিকাংশ ঘটনা
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাবনার ঈশ্বরদীতে ভবানীপুর উত্তরপাড়ার দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন তার আত্মীয় ট্রাকচালক শরিফুল ইসলাম (৩৫)। কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করতেন তিনি। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে কিশোরীর বাসায় ঢোকেন শরিফুল। তাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে তার দাদি বাধা দেন। এ সময় হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে বৃদ্ধাকে হত্যা করা হয়। কিশোরী চিৎকার করলে তাকেও মারধর করায় অচেতন হয়ে পড়ে। তখন তাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির পেছনে নিয়ে যৌন নিপীড়নের পর হত্যা করা হয়। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার শরিফুল ধর্ষণ ও জোড়া খুনের কথা স্বীকার করেন।
দেশে শিশু-কিশোরী থেকে বিভিন্ন বয়সের নারীর ওপর সহিংসতা ও নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল জগৎ– সবখানেই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন তারা। অধিকাংশ ঘটনা নীরবে সহ্য করা হয় লজ্জা, ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায়। তাই সংখ্যার হিসাব যতটা সামনে আসে, বাস্তবে ঘটে তার চেয়ে অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস। তবে এই দিবসে দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি নেওয়া হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন হয়রানি সামাজিক ব্যাধি। এটি নির্মূল করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কর্মসূচি জরুরি। এ ছাড়া দ্রুত বিচারের মাধ্যমে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন থানায় নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় সাত হাজার ৬৮টি মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩১ নারী ও শিশু। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১০ জন। হত্যার শিকার হয়েছেন সাতজন। ছয়জনকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সহিংসতা, নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৮৫১ নারী ও শিশু। উত্ত্যক্তকারীদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৯৩ নারী। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৪৯টি। ভুক্তভোগীদের বড় অংশ শিশু-কিশোরী। বছরজুড়ে এক হাজার ২৪ শিশু নানাভাবে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ শিশুকে।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, প্রতিবছরের ৪ মার্চ পালিত হয় বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যৌন সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকট। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী ও শিশু যৌন নিপীড়ন মারাত্মক সমস্যা। আইন থাকলেও অপরাধীদের শাস্তি অনেক সময়েই কার্যকর হয় না। লজ্জা, তথ্যের অভাব এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি সহমর্মিতার অভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা প্রকাশ করা হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যৌন শিক্ষার প্রবর্তন, ন্যায়বিচার দ্রুত নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ আশ্রয় ও মানসিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা একটি নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি, যেখানে কোনো নারী বা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হবে না।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে স্থানীয় পাঁচ যুবক তুলে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে গ্রামের সরিষা ক্ষেত থেকে কিশোরীর মরদেহ পাওয়া গেছে। কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ১৮৩ নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৭৩ কন্যাশিশু এবং ১১০ জন নারী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, গত বছর দুই হাজার ৮০৮ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৫৪৩ কন্যাশিশু ও ২৪৩ নারী। যৌন নিপীড়নের শিকার ১৬৯ জনের মধ্যে ১১২ কন্যাশিশু। এর মধ্যে উত্ত্যক্তের শিকার ৫৫ জন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী মাসুদা রেহানা বেগম বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। আইন আছে, কিন্তু সেভাবে বাস্তবায়ন হয় না। আমরা চাই, প্রতিটি ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতকে আইনের আওতায় আনা হবে। যৌন নিপীড়ন, সহিংসতা বা উত্ত্যক্ত করার প্রতিটি ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে পুলিশ শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে গ্রহণ, গোপনীয়তা রক্ষা এবং দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নারী ও কন্যাশিশুদের সব ধরনের যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে রক্ষার জন্য দেশে আইন রয়েছে। সেই আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে অগ্রগতির সুযোগ থাকলেও আমরা হোঁচট খাচ্ছি। আইনের প্রয়োগ যথাযথ হওয়া প্রয়োজন।
- বিষয় :
- যৌন হয়রানি
