পাঞ্জাবির বাজার
উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রি মূল্য অনেক বেশি
ক্রেতার ক্ষোভ, বিক্রেতার যুক্তি, মূল্যসীমা না থাকায় ব্র্যান্ডের একচেটিয়া ব্যবসা
ঈদ কেনাকাটায় ব্যস্ত নগরবাসী। গতকাল সোমবার রাজধানীর আজিজ সুপারমার্কেটে পাঞ্জাবি দেখছেন এক ক্রেতা- ফোকাস বাংলা
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ | ০৯:১৯ | আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ | ১০:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর অভিজাত শপিংমল ও নামি ব্র্যান্ডগুলোর শোরুমে পাঞ্জাবির দাম নিয়ে চলছে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পাঞ্জাবির গায়ে সাঁটানো ‘প্রাইস ট্যাগ’ মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এমন আকাশচুম্বী দামে ক্রেতারা যেমন হতাশ, তেমনি ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, ব্র্যান্ড ভ্যালু আর আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীরা মানুষের পকেট কাটছে। তবে অস্বাভাবিক হারে দাম নিলেও সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ নিয়ে কোনো নজরদারি নেই।
ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের এসব পাঞ্জাবির কাপড় আমদানি করা ও উন্নতমানের। পাঞ্জাবিগুলো বিশেষ যত্নে ও কারুকার্যে তৈরি করা। মানের দিক থেকে অনন্য হওয়ার কারণে দাম বেশি। তাছাড়া বিশাল শোরুম ভাড়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তারকাদের দিয়ে বিজ্ঞাপন এবং বছরজুড়ে অবিক্রীত পণ্যের ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই দাম বাড়ানো হয়।
গত রোববার রাজধানীর ধানমন্ডি ও বসুন্ধরা সিটিতে এলিয়েন, আড়ং, অঞ্জন’স, জেন্টল পার্ক, দেশীদশসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের শোরুম ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
খরচ বনাম আকাশছোঁয়া দাম
দামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে এলিয়েন। এই ব্র্যান্ডের শোরুমে পাঞ্জাবির সর্বনিম্ন দাম তিন হাজার ৯৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৯৫০ টাকা। আড়ংয়ের শোরুমে সর্বোচ্চ দর দেখা গেছে ১৬ হাজার ৪৩৭ টাকা। তবে আড়ংয়ে এক হাজার ৮০০ বা দুই হাজারের মধ্যেও পাঞ্জাবি কেনা যাবে। এর সঙ্গে ক্রেতাকে ১০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। সেই হিসাবে এলিয়নের সবচেয়ে ভালো পাঞ্জাবি কিনতে হলে সাড়ে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ করতে হবে।
তবে অঞ্জন’স, দেশীদশ, রোব, টপ-টেনসহ অন্যান্য শোরুমে মোটামুটি দেড় থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে পাঞ্জাবি কেনা যাবে।
অন্যদিকে নিউমার্কেট কিংবা ফার্মগেটের সাধারণ দোকান থেকে মোটামুটি মানের একটা পাঞ্জাবি কেনা যাচ্ছে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায়। সোমবার ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারে কয়েকটি টেইলার্সের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটা পাঞ্জাবি তৈরির জন্য টেইলার্স কাজের ধরনভেদে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি নিয়ে থাকে। কাজের জটিলতা ও লাইনিং থাকলে মজুরি আরও বেশি। এর সঙ্গে বোতাম, বকরম, সুতা, লাইনিং কাপড় (ভেতরে আস্তরের জন্য) লাগে। এ জন্য অতিরিক্ত ১০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হতে পারে। প্রতিটি পাঞ্জাবি বানাতে তিন থেকে সাড়ে তিন গজ কাপড় লাগে। সাধারণ মানের কাপড়ের গজ ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে কেনা যায়। খরচের হিসাবে সর্বোচ্চ সীমা ধরলেও একটা পাঞ্জাবিতে খরচ হতে পারে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা।
ক্রেতার ক্ষোভ, বিক্রেতার যুক্তি
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে ব্র্যান্ডগুলোর এসব পাঞ্জাবি তৈরি করতে আসলে কত টাকা খরচ হয়? দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হয়? রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে বসুন্ধরা সিটিতে কেনাকাটা করতে আসা মাহমুদ হাসান এলিয়েন থেকে প্রায় আট হাজার টাকা দামে একটা পাঞ্জাবি কেনেন। তিনি বলেন, এখন যেসব পাঞ্জাবির দাম আট থেকে ১০ হাজার টাকা, সেগুলো এক-দেড় মাস আগে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা কম ছিল। তাঁর ভাষ্য, ঈদকে পুঁজি করে ব্র্যান্ডগুলো অতিরিক্ত দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
আড়ং থেকে প্রায় চার হাজার টাকায় পাঞ্জাবি কেনার পর মগবাজারের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, শুধু ব্র্যান্ডের কারণে আড়ং থেকে কেনা। কিন্তু যেভাবে দাম বাড়াচ্ছে তা অযৌক্তিক।
তবে দাম বাড়ানোর ব্যাপারে উচ্চ শ্রেণির ভোক্তাদেরও দুষছেন এই ক্রেতা। তাঁর দাবি, এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা নানা অসৎ উপায়ে টাকা কামায়। এখানে এসে দামের তোয়াক্কা করে না। বরং কত বেশি দামে কিনতে পারছে সেটাই তাদের কাছে বড় ক্রেডিট। এ ধরনের ক্রেতাকে টার্গেট করেই প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ায়। যার প্রভাব পড়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর।
বসুন্ধরা সিটিতে আড়ংয়ের শোরুমের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রয়কর্মী জানান, এসব ব্যাপারে তারা কিছু জানেন না। তবে আড়ংয়ের উন্নতমানের কারুকার্য, কাপড় ও অন্যান্য খরচ হিসাব করেই দাম নির্ধারণ করা হয়।
বসুন্ধরা সিটির এলিয়েনের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, তাদের কোম্পানির সব পাঞ্জাবির কাপড় আমদানি করা। সম্পূর্ণ দুর্লভ কারুকার্য। পোশাক বানানো হয় বিশেষ ব্যবস্থাপনায়। সব মিলিয়ে তাদের খরচ বেশি পড়ে। পণ্যের মানও অন্যদের তুলনায় ভিন্ন। সে জন্য দাম বেশি।
তবে তুলনামূলক কম পরিচিত কয়েকটি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কর্মীরা জানান, বড় ব্র্যান্ডগুলো পাঞ্জাবির দাম বাড়ালে ফেব্রিক্স এবং অন্যান্য কাঁচামালের দামও কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়। এ ছাড়া বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে টিকে থাকতে ছোট শোরুমের ডেকোরেশন ও মার্কেটিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হয়। ফলে তাদেরও দাম বাড়াতে হচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, পোশাকে কোনো নির্দিষ্ট মূল্যসীমা না থাকায় ব্র্যান্ডগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করছে। এতে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে পোশাক-আশাকের দাম। সরকারের উচতি এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
এ বিষয়ে ফ্যাশন উদ্যোগ, ফ্যাশন এন্টারপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ও অঞ্জন’সের স্বত্বাধিকারী শাহিন আহম্মেদ সমকালকে বলেন, দাম নির্ধারণ করে পাঞ্জাবির কাপড়, সহযোগী অন্যান্য উপকরণ, মজুরি ইত্যাদির ওপর।
সাধারণত একটা পাঞ্জাবি বানাতে কত টাকা খরচ হয়– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা আপেক্ষিক ব্যাপার। ব্র্যান্ডগুলো বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতাকে লক্ষ্য করে পণ্য উৎপাদন করে এবং ওই শ্রেণির ক্রেতাদের কাছেই সেসব পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্য থাকে। সে ক্ষেত্রে পণ্যে নানা তারতম্য থাকে। এতে করে দামেও ফারাক থাকে। তবে তার ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবির দাম নাগালে রয়েছে বলে দাবি এই ফ্যাশন উদ্যোক্তার।
- বিষয় :
- ঈদের কেনাকাটা
- ঈদুল ফিতর
- পাঞ্জাবি
