গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা
জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর তাগিদ
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতায় ইমার্জেন্সি মেডিসিন শক্তিশালী করার রূপরেখা
কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিরা সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে সমন্বিত প্রশিক্ষণ, প্রটোকলভিত্তিক চিকিৎসা এবং গ্রামীণ পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে একটি কার্যকর রূপরেখা প্রণয়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত অতিথিরা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি: অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ মেডিকেল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (অস্ট্রেলিয়া) ও প্রথম আলো। গোলটেবিল সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
গ্রামে শুরু হোক ইমার্জেন্সি কেয়ার বিপ্লব
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী চিকিৎসক ফারহানা হাসান বলেন, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা শুধু শহরকেন্দ্রিক থাকলে চলবে না, গ্রামেই শুরু করতে হবে এর ভিত্তি। বগুড়ায় একটি পাইলট প্রকল্প চালুর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সিপিআর ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিতে পারলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য অ্যাম্বুলেন্সচালক, প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় জনগণের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সচেতনতার অভাবে বাড়ছে অঙ্গচ্ছেদ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সায়েদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে দেরিতে রোগ নির্ণয়ের কারণে অঙ্গচ্ছেদের হার বেশি। অথচ অস্ট্রেলিয়ায় দ্রুত শনাক্তকরণ ও গাইডলাইন অনুসরণের ফলে এ হার অনেক কম। তিনি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের গাইডলাইন চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণেই আসবে পরিবর্তন
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার ডা. বিলকিস আকতার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশে ছয় মাস মেয়াদি ইমার্জেন্সি মেডিসিন সার্টিফিকেট কোর্স চালু হয়েছে। এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. রেজা আলী। তিনি বলেন, সঠিক কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব।
ট্রায়াজ না থাকায় ঝুঁকিতে রোগী
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. গোলাম সারওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ট্রায়াজ সিস্টেম না থাকায় এক বুকে ব্যথার রোগীকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, ইমার্জেন্সি বিভাগে ‘আগে আসলে আগে’ নয়, বরং রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। শক্তিশালী ইমার্জেন্সি বিভাগ গড়ে উঠলে অনেক রোগীকেই ভর্তি না করে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব, যা হাসপাতালের চাপ কমাবে।
প্রটোকল ও প্রযুক্তির অভাব বড় বাধা
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. রাসেল আহমেদ বলেন, দেশে দক্ষ চিকিৎসক ও অবকাঠামো থাকলেও অভাব রয়েছে কার্যকর প্রটোকল ও পদ্ধতির। তিনি নির্দিষ্ট হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে ইমার্জেন্সি মেডিসিন কোর্স চালুর প্রস্তাব দেন।
শিক্ষা থেকে শুরু করতে হবে পরিবর্তন
এভারকেয়ার হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, জরুরি সেবা বিষয়ে পেশাজীবীদের মধ্যে ধারণা কম। ইন্টার্নশিপ পর্যায় থেকেই ইমার্জেন্সি মেডিসিন প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। আমাদের চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগের সার্জন হতে চান না। কারণ, এর গুরুত্ব আমাদের কাছে নেই।
চিকিৎসা-শিক্ষা ব্যবস্থায় জরুরি চিকিৎসা দক্ষতা যুক্ত করা
বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসা-শিক্ষা ব্যবস্থায় জরুরি চিকিৎসা দক্ষতা, বিশেষ করে সিপিআরসহ মৌলিক জীবনরক্ষাকারী প্রশিক্ষণ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক মানে দক্ষ করে তুলতে হলে শিক্ষা কারিকুলামেই এসব বিষয় সংযোজন জরুরি।
হচ্ছে নতুন রূপরেখা
অনুষ্ঠানের সভাপতি সিডনির ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্নের অধ্যাপক ও অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের সদস্য ডা. রেজা আলী বলেন, ১৬ বছরের প্রচেষ্টায় ইমার্জেন্সি মেডিসিন বিষয়টি একটি অবস্থানে পৌঁছেছে। আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে একটি খসড়া পরিকল্পনা সরকারের কাছে জমা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া ভবিষ্যতে বগুড়ায় একটি আন্তর্জাতিক মানের ইমার্জেন্সি মেডিসিন কনফারেন্স করা এবং সেখানে সিমুলেশন ট্রেনিং ও অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত
হোসেন জরুরি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে একটি সুপারিশপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। আমরা এ বিষয়ে সহযোগিতা করব।
- বিষয় :
- স্বাস্থ্যসেবা
