ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

গবেষণা ও পরিকল্পনায় ঘাটতি, রোগ প্রতিরোধে পিছিয়ে দেশ

গবেষণা ও পরিকল্পনায় ঘাটতি, রোগ প্রতিরোধে পিছিয়ে দেশ
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৭ | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়ছে দেশ। সংক্রামক ও অসংক্রামক— উভয় ধরনের রোগে সঠিক চিকিৎসার অভাবে ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। সাম্প্রতিক সময়ে হামের বিস্তার দেশের স্বাস্থ্য খাতের নাজুক চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সোমবার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। প্রতি বছর দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ।’ এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার করে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করায় জোর দেওয়া হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। বর্তমান সরকার ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রত্যেক নাগরিকের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ নীতির আলোকে রোগীর মৌলিক পরিচয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে সব নাগরিককে ইলেক্ট্রনিক হেলথ (ই-হেলথ) কার্ড প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার এবং দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য খাত গড়ে তুলতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, গৃহীত কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন, নিবিড় মনোযোগ ও যথাযথ বিনিয়োগের ফলে অচিরেই সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ও সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণীতে বলেন, মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ শুরু করেছে। সে লক্ষ্যে শহর ও গ্রামে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। ধাপে ধাপে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী বা হেলথ কেয়ারার নিয়োগ করা হবে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ হবেন নারী। এ ছাড়া প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড, দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ব্যবস্থা চালু করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান উন্নয়ন ও চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় রাখতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। স্বাস্থ্যবীমা চালু ও ধীরে ধীরে বিস্তার, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার এবং সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার জন্য ন্যায়সংগত আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক দশকে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কিডনি জটিলতা, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস এবং মানসিক অসুস্থতার মতো সমস্যা বেড়েছে। আক্রান্তরা ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। এসব রোগের চিকিৎসায় শতাধিক মেডিকেল কলেজ, একটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ২০টি বিশেষায়িত হাসপাতালসহ নামিদামি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। তবে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না হওয়া ও সেবা খাতে অনেক অব্যবস্থাপনা রয়েছে। রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও সদ্ব্যবহারের ঘাটতি আছে।

বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও গবেষণা ব্যবস্থাপনা উন্নত করার দাবি উঠছে দীর্ঘদিন ধরেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এমনিতেই কম, তার ওপর প্রস্তাবিত বাজেটও অনেক সময় কমিয়ে দেওয়া হয়। তিনি জানান, প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টাকা গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকলেও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতির কারণে এই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। অডিট আপত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনেক সময় নিরুৎসাহিত হন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েবা আক্তার বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণালব্ধ প্রমাণ ছাড়া ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, শুধু গবেষণা পরিচালনা নয়, বরং গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, গবেষণামুখী মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু পোস্টগ্র্যাজুয়েশন নয়, এমবিবিএস বা স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ এই তিনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে গবেষণা পরিচালিত হলে রোগের আগাম লক্ষণ শনাক্ত করা সহজ হবে এবং প্রতিরোধে অগ্রগতি সম্ভব হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে বিএমআরসির মতো প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা এবং জাতীয় পর্যায়ের গবেষণাগারগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি গবেষণায় সফলদের জন্য প্রণোদনা চালু করলে অন্যরাও উৎসাহিত হবেন। তাঁর মতে স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হলে গবেষণাভিত্তিক নীতি, সুশাসন এবং সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। তা না হলে ভবিষ্যতে দেশ আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে।

বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচি
দিবসটি ঘিরে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল ‘সেবা সপ্তাহ’ পালন করবে। এ উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ‘খেলাধুলা বাড়ায় প্রাণ, হৃদয় থাকে শক্তিমান’ শীর্ষক গণমুখী সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ দিনব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান হেলথ রান’, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, র‍্যালি, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, বৃক্ষরোপণ, বিতর্ক ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এই বিভাগের শিক্ষক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মহামারি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আরও পড়ুন

×