এসএসসি পরীক্ষা
স্বপ্ন জয়ের লড়াইয়ে ছয় শিক্ষার্থী
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জমজ বোন স্বপ্নীল, স্বর্ণালী ও সেঁজুতি বর্মণ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সমকাল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জীবন সংগ্রামে প্রতিকূলতা আসবেই, কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে যারা এগিয়ে যায়, তারাই প্রকৃত বিজয়ী। এবারের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় এমন চার শিক্ষার্থীর গল্প উঠে এসেছে, যাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা পারিবারিক দৈন্য দমাতে পারেনি। ঠাকুরগাঁওয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরীফ আলী, জয়পুরহাটের এক হাতহীন মো. নাহিদ এবং কুড়িগ্রামের দৃষ্টি জয়ী মৃধা ফারজানা মিতু প্রমাণ করেছে, প্রবল ইচ্ছা থাকলে আকাশ ছোঁয়া অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, একই পরিবার থেকে তিন যমজ বোনের একসঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ সমাজে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। এই অদম্য মেধাবীদের লড়াই কেবল একটি পরীক্ষা নয়, বরং জীবনজয়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক।
শরীফের আলোহীন চোখে স্বপ্ন
ঠাকুরগাঁওয়ের গোবিন্দনগর মুন্সিরহাট মহল্লার বাসিন্দা ইজিবাইকচালক রমজান আলীর ছেলে শরীফ আলী জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তিহীন। কানে শুনে পড়া মুখস্থ করে সে আজ এসএসসি পরীক্ষার আসনে বসেছে। সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে একজন শ্রুতিলেখকের সহায়তায় সে বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় অংশ নেয়। শরীফের একমাত্র লক্ষ্য পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করা, যেন অভাবি মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে।
যমজ বোনের গল্প
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের ঠান্ডারাম বর্মণ ও ময়না রানী সেনের যমজ মেয়ে স্বপ্নীল, স্বর্ণালী ও সেঁজুতি বর্মণ এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। ২০০৯ সালে জন্ম নেওয়া এই তিন বোন ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে পড়াশোনা ও খেলাধুলা করে বড় হয়েছে। এমনকি, স্কুলড্রেস পরে যখন তারা একসঙ্গে বিদ্যালয়ে যেত, অনেক সময় শিক্ষকদের পক্ষেও তাদের আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ত। কেবল পড়াশোনাই নয়, তারা তিনজনই বেতারের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী। ভবিষ্যতে কেউ বিসিএস ক্যাডার, কেউ চিকিৎসক আবার কেউ শিক্ষক হতে চায়। এই তিন রত্নকে মানুষের মতো মানুষ করতে তাদের বাবা-মা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এবং প্রশাসন থেকেও তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এক হাতে লিখে এগিয়ে চলা নাহিদের
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার মো. নাহিদও সমানভাবে অনুপ্রেরণার প্রতীক। জন্ম থেকেই তার ডান হাতের কনুইর নিচের অংশ নেই। তবুও বাঁ হাত দিয়েই স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের মতো পরীক্ষা দিচ্ছে সে। আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে তাকে অনর্গল লিখতে দেখা গেছে।
নাহিদ পৌর এলাকার শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম ও নাসিমা বিবির ছেলে। সাত বছর আগে বাবার মৃত্যু এবং তিন বছর আগে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম সংকটে পড়ে। বর্তমানে মা গরু পালন ও আলুর চিপস তৈরি করে সংসার চালান।
অভাব-অনটনের মধ্যেও নাহিদ পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিটি শ্রেণিতেই সে মেধার পরিচয় দিয়েছে।
অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে মিতু
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় দাখিল পরীক্ষার্থী মৃধা ফারজানা মিতুর লড়াইটা অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ও কষ্টকর। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা থাকার কারণে যেখানে তার অতিরিক্ত সময় ও বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে প্রথম দিনের পরীক্ষায় সে কোনো বাড়তি সুবিধাই পায়নি। এর আগে তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া মিতু এবারও বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় সময়ের অভাবে আশানুরূপ লিখতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছে। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সময়মতো আবেদন না করায় এই জটিলতা তৈরি হলেও পরে তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিস। ভাঙ্গামোড় দাখিল মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মিতু মনে করে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সুযোগ পেলে সে অবশ্যই ভালো ফল করতে সক্ষম হবে।
কেন্দ্র সচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, ওই প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী মিতুর পক্ষ থেকে আবেদন পাওয়া গেলে, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ফুলবাড়ী উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুস সালাম জানান, পরীক্ষার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে।
অনুপ্রেরণা ও আগামীর প্রত্যাশা
এই চারজন শিক্ষার্থীর গল্পই সমাজের জন্য এক বিশাল বার্তা বহন করে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা চরম দারিদ্র্য যে মেধা ও প্রচেষ্টার পথে বাধা হতে পারে না, তা তারা হাতেকলমে দেখিয়ে দিচ্ছে। কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দসহ যেসব নীতিমালা রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করা হলে এই শিক্ষার্থীরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
- বিষয় :
- পরীক্ষা
- এসএসসি
- জীবন-সংগ্রাম
