পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে চাষের কী হবে, প্রশ্ন কৃষকের
বগুড়ার শহরতলির মাটিডালির পাম্প থেকে ডিজেল নিয়ে ফিরছেন এক কৃষক সমকাল
লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেলা গড়িয়ে বিকেল। শহরের উপকণ্ঠে একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে লম্বা লাইন। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস-ট্রাকের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন তারা কয়েকজন। চোখেমুখে অপেক্ষার ক্লান্তি। তারা সবাই সেচ পাম্পের মালিক বা কৃষক। ডিজেল নিতে এসে দাঁড়িয়ে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই চিত্র এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে বগুড়ার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে। চলতি বোরো মৌসুমে যখন ধানক্ষেতে সেচ দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, ঠিক তখনই জ্বালানি তেলের টানাটানি কৃষকদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে দিন পার হয়ে গেলে চাষবাস করবেন কখন– এ প্রশ্ন এখন কৃষকের।
সম্প্রতি শহরের একটি ব্যস্ত পাম্পে কথা হয় শাজাহান আলীর সঙ্গে। তিনি শেখেরকোলা থেকে এসেছেন। সঙ্গে দুটি জারিকেন। সকাল ১০টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, তখন বিকেল ৩টা। তাঁর সিরিয়াল আসেনি। একবার তেল না পেলে মেশিন বন্ধ হয়ে যাবে। জমিতে পানি দিতে না পারলে সব শেষ, কথা বলতে বলতে কপালের ঘাম মুছছিলেন তিনি।
দুপচাঁচিয়ার একটি পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের আগেই ডিজেল শেষ। পাম্পের ডিসপেনসার কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। পাশে কয়েকজন কৃষক হতাশমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের একজন বলেন, সকাল থেকে আছি। এখন বলে তেল নাই। কাল আবার আসতে হবে। এভাবে চাষ হয়?
বগুড়া জেলায় ৭২টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। সাম্প্রতিক সংকটে অনেক পাম্পে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কিছু পাম্প আংশিক, আবার কিছু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগীয় পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রতন বলেন, এখন সরবরাহ আবার শুরু হয়েছে, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে বগুড়া জেলায় দৈনিক গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ টন ডিজেলের চাহিদা তৈরি হয়, যার বড় অংশই গেছে সেচ ও পরিবহন খাতে। কিন্তু সরবরাহ মিলেছে গড়ে ২২০ থেকে ২৪০ টনের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টন ঘাটতি, যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের হিসাব বলছে, প্রতি হেক্টর বোরো জমিতে সেচের জন্য পুরো মৌসুমে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। একটি শ্যালো মেশিনচালিত পাম্প এক মৌসুমে ৩০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল খরচ করে। অনেক এলাকায় সেচে বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল লাগে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও পুরো সেচ ব্যবস্থা নড়বড়ে করে দিতে পারে।
দুপচাঁচিয়ার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ধানের এখন ক্রিটিক্যাল সময়। পাঁচ-সাত দিন পানি না দিলে গাছ শুকিয়ে যাবে। তেল না পেলে আমরা কীভাবে সেচ দেব? তালোড়ার কৃষক আজিজার রহমান বলেন, আমরা এখন শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে নেই, তেলের জন্যও তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থা থাকলে ফলন কমে যাবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া তেল দেওয়া হচ্ছে না। তবে অনেকেই বলছেন, এতে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও গ্রাম থেকে আসা কৃষকদের জন্য নতুন ঝামেলা তৈরি হচ্ছে। কারণ অনেক সময় তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনতে পারেন না।
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বোরো চাষ প্রায় পুরোপুরি সেচনির্ভর হওয়ায় এখানে চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। বগুড়া জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এই বিশাল আবাদ পুরোপুরিই সেচনির্ভর। জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার সেচ পাম্প সক্রিয়। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত, বাকি অংশ বিদ্যুৎনির্ভর। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, এই মৌসুমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেলের প্রয়োজন হয়। যদি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটে, তাহলে এর প্রভাব একসঙ্গে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে পড়ে। আমরা বিষয়টি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দেখছি, যাতে সেচ খাতে জ্বালানি সরবরাহ অগ্রাধিকার পায়।
- বিষয় :
- জ্বালানি সংকট
