এইচআইভি পরীক্ষার সুযোগ নেই ৪১ জেলায়, শনাক্তের ২৬ শতাংশ চিকিৎসার বাইরে
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৩২
দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে।
বুধবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) এই কর্মশালার আয়োজন করে, সহযোগিতায় ছিল এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ)।
এর মধ্যে নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বাস্তবতা এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টায় বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে।
কর্মশালায় জানানো হয়, দেশে প্রথম এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতি বছর নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়েছে। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বড় অংশ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা। এইচআইভি-জনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। দেশে প্রথম মৃত্যু হয় ২০০০ সালে। ২০২৫ সালে এ রোগে মারা গেছেন ২৫৪ জন, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম।
একসময় শিরায় মাদক গ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হলেও এখন চিত্র বদলাচ্ছে।
২০২০ সালের পর থেকে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার দ্রুত বাড়ছে। কর্মশালায় জানানো হয়, এ গোষ্ঠীতে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০.৭ শতাংশ, যা ২০২০ সালে বেড়ে ৩.১ শতাংশে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
এএইচএফ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। শনাক্তদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসা পাচ্ছেন, যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।
সংক্রমিতদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, ৬ শতাংশ শিরায় মাদকগ্রহণকারী। নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর হার ১ শতাংশ করে। বাকি ২২ শতাংশ অন্যান্য শ্রেণির মানুষ।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ রয়েছে—১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ৫ বছরের কম বয়সী ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। পাশাপাশি বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কালবেলার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী হিসেবে সমকামী জনগোষ্ঠী উঠে এসেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রবাসী শ্রমিক। তাই বিদেশফেরতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্টিগমাই বড় বাধা
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক স্টিগমা ও বৈষম্য এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা।
তিনি বলেন, স্টিগমা মানুষকে আড়ালে ঠেলে দেয়। এতে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়, ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো রোগের কারণে কাউকে চিহ্নিত করা বা চাকরি থেকে বঞ্চিত করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। সঠিক চিকিৎসা পেলে এইচআইভি এখন আর মৃত্যুদণ্ড নয়; এটি ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। বর্তমানে এমন দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশনও এসেছে, যা বছরে একবার নিলেই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিএইচআরএফ-এর সভাপতি প্রতীক ইজাজ। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। অনুষ্ঠানে এইচআইভি পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও সমাধান নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
- বিষয় :
- এইচআইভি আক্রান্ত
- চিকিৎসা
- রোগ
