ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ডিসি সম্মেলন শুরু আজ

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুসহ ৪৯৮ প্রস্তাব

সরকারি কর্মকর্তাদের  জন্য স্বাস্থ্য বীমা  চালুসহ ৪৯৮ প্রস্তাব
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ০৯:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর প্রস্তাব করেছেন জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। এতে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের অনিশ্চয়তা কমবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হবে বলে মনে করেন তারা। এ ছাড়া ডিসির বাসভবনে বাবুর্চি, বাজেটের অর্থ ১৫ এপ্রিল বরাদ্দসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবারের ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে এসব প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আজ রোববার শুরু হচ্ছে চার দিনের এই সম্মেলন। উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

স্বাস্থ্য বীমা চালুর পক্ষে যুক্তি দিয়ে রাজবাড়ীর ডিসি আফরোজা পারভীন বলেছেন, স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ হবে। কর্মীদের শারীরিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ও উৎপাদনশীলতা উন্নত হবে। দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সহায়তা ও ক্ষতিপূরণমূলক ব্যয়ের পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক বীমা মডেল গ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি টেকসই ও কাঠামোবদ্ধ স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

সম্মেলন উপলক্ষে সারাদেশ থেকে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্য থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বাছাই করা ৪৯৮টি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

দুর্গম অঞ্চলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন সুবিধা প্রদান, পাহাড়ি ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ এবং ঝুঁকি-ভাতা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের ডিসি প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, দুর্গম এলাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও কষ্ট বেশি। রেশন ও বাড়তি ভাতা দিলে জনবল ধরে রাখা ও প্রেষণা বৃদ্ধি পাবে। 

গাজীপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রংপুরে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল, নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ও গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) নিয়োগ দেওয়াসহ নানা প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসিরা। 

ডিসির বাসভবনে চান বাবুর্চি     
দেশের সব ডিসির বাসভবনে বাবুর্চি নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন মাদারীপুরের ডিসি মর্জিনা আক্তার। প্রস্তাবের পক্ষে তিনি বলেন, দেশের জেলাগুলো এ, বি ও সি ক্যাটেগরি নির্ধারণ করায় সব জেলার প্রশাসকের বাসভবনে বাবুর্চি নেই। বাংলো শুধু জেলা প্রশাসকের বাসভবন নয়; এটি জেলা প্রশাসকের অফিসও। এ জন্য জেলা প্রশাসকের বাসভবনে ক্যাটেগরি এ, বি ও সি সব জেলা প্রশাসকের বাসভবনে বাবুর্চি পদ সৃজনের সুপারিশ করা হয়েছে। 

সম্মেলনের পরিধি বাড়ল, কমলো বাজেট
এদিকে এবার ডিসি সম্মেলনের পরিধি বাড়ানো হয়েছে, তবে বাজেট গতবারের তুলনায় অর্ধেকেরও কমে নামিয়ে আনা হয়েছে। গতকাল শনিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এ তথ্য জানান।

সচিব বলেন, গত বছরের ডিসি সম্মেলনের বাজেট ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যেখানে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ২ লাখ টাকা। চলতি বছরের জন্য বাজেট ধরা হয়েছে ৭১ লাখ টাকা, যা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। যেসব খাতে ব্যয় না করলেও চলে, সেগুলো বাদ দিয়ে ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে এবং বাস্তব ব্যয় আরও কমানোর চেষ্টা থাকবে।

বাজেটের অর্থ ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ছাড়ের প্রস্তাব
এসব প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে জাতীয় বাজেটের সব অর্থ ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ছাড় করা, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক আট লেনে উন্নীত করা, চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, জেলাভিত্তিক দরিদ্র পরিবারের সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করা, সব শিশুর শিখন নিশ্চিত করতে একীভূত শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, কওমি মাদ্রাসা স্থাপনে নীতিমালা প্রণয়ন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ভাষায় শিক্ষক নিয়োগ করা ইত্যাদি। ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো ও ওঁরাও (সাদরি)—এই পাঁচ জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে নিজস্ব ভাষার দক্ষ শিক্ষকের অভাবে কার্যকর পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। 

সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি
সম্মেলনে সিদ্ধান্তগুলো তিন ভাগে বাস্তবায়ন করা হয়। এগুলো হলো স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশি সময় লাগে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত গতবারের ডিসি সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৬১ শতাংশ। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি সিদ্ধান্ত ৩৫ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত ১৬ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মন্ত্রী ও সচিবদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ-সংক্রান্ত বিষয়ে ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মাঠপর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ডিসিরা নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাদের প্রস্তাব এই সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা। প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও আওতাধীন সংস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং আইন মন্ত্রণালয় বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রথম দিনের অধিবেশন শেষে ডিসিরা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

দ্বিতীয় দিনে আগামীকাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ-সম্পর্কিত আলোচনা হবে। এ ছাড়া এদিন জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন ডিসিরা। তৃতীয় দিনে ৫ মে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা হবে। একই দিনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ডিসিরা। এদিন নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনার কথা রয়েছে।

৬ মে সম্মেলনের শেষ দিনে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা হবে। এদিন রাতে রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা হবে। সেখানে ডিসিসহ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন।

আরও পড়ুন

×