ইভিএম প্রকল্প
ব্যয়ের বোঝা টানতে পারছে না ইসি
পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রগুলো
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্প এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য ব্যয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইভিএম যন্ত্র ভবিষ্যতে ব্যবহার হবে কিনা, এ বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়ায় এ নিয়ে জটিলতা কাটছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুই বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রগুলো। ২০১৮ সালে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকায় কেনা দেড় লাখ যন্ত্রের মধ্যে এক হাজার ৫৯৯টির খোঁজ নেই। বাকি যন্ত্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ওয়্যারহাউস এবং দেশের ৪১টি জেলার বেসরকারি গুদাম ভাড়া বাবদ বিশাল অঙ্কের অর্থ গুনতে হচ্ছে ইসিকে। ওয়্যারহাউস ভাড়া বাবদ পাওনা ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধের তাগাদা দেওয়ার পাশাপাশি এগুলো আর নিজেদের জিম্মায় রাখার বিষয়ে অপারগতা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বিএমটিএফ। যন্ত্রগুলো সংরক্ষণ বাবদ বছরে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েও পরিকল্পনা কমিশনের সাড়া পায়নি ইসি।
দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ইভিএম প্রকল্প ঘিরে এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে। এর আগে নির্বাচন কমিশনের তিন কর্মকর্তাকে এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। প্রকল্প ঘিরে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তি রয়েছে। ইভিএমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইসি গঠিত অভ্যন্তরীণ কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে। অবশ্য দুদকের মামলা ও নিরীক্ষা আপত্তির নিষ্পত্তি ছাড়া ইসি গঠিত কমিটি এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ দিতে পারছে না। এতে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না ইসি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ওই বছরের নভেম্বরে এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেন। পরে ইভিএমের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে ইসি কর্মকর্তা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগসহ (আইএমইডি) সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি করা হয় নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব মঈন উদ্দীন খানকে। কমিটি এখনও প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
এদিকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সুপারিশ করে। জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর যে প্রতিবেদন দেয়, তাতে ইভিএম প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রকল্প বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকসহ ইসির সঙ্গে আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোও একই মনোভাব দেখায়। এরপর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধনী এনে ইভিএমের অংশ বাদ দেয় ইসি। সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার হয়নি।
গত ৬ এপ্রিল ইসির ১১তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রস্তুতির পর্যায়ে থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ইভিএমের ব্যবহার করা হবে না।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কোনো ইভিএম শতভাগ ভালো থাকার কথা নয়। কারণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুনে। আবার ইভিএমগুলো ভালো রাখতে ২১ দিন পরপর ব্যাটারি চার্জ দিতে হয়। কিন্তু গত দেড় বছর যন্ত্রগুলো চার্জ ছাড়াই পড়ে আছে। এতে বেশির ভাগ যন্ত্রের কন্ট্রোল ইউনিট, মনিটর, ব্যাটারি ও কেবলগুলো এখন অকেজো।
ভাড়া মেটাতেও হিমশিম
ইভিএমের ভাড়া বাবদ ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবির পাশাপাশি ওয়্যারহাউস খালি করতে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ইসিকে চিঠি দেয় বিএমটিএফ। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে ইভিএম সংরক্ষণের বিষয়টি না থাকায় বকেয়া পরিশোধ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও সুরাহা হয়নি।
এ ছাড়া বেসরকারি গুদাম ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ৩৩ লাখ টাকা গচ্চা যাচ্ছে।
এর আগে ইভিএম সংরক্ষণে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে ৪০ কোটি টাকা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তবে পরিকল্পনা কমিশন সে টাকা দেয়নি।
বিলুপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম সমকালকে জানান, তাদেরও সুপারিশ ছিল ইভিএমের মতো নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর কিছুর ব্যবহার যেন আর কোনো নির্বাচনে না হয়। তিনি বলেন, দুদকের উচিত অতি দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি এবং ইভিএমগুলো পরিদর্শন করে এগুলো ধ্বংসের নির্দেশনা দিয়ে ইসিকে জঞ্জালমুক্ত করা।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সমকালকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আছে যে আমরা নির্বাচনে আর ইভিএম ব্যবহার করব না। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সুপারিশ এবং মেশিনগুলোর সচল-অচল বিষয়ে ইসি গঠিত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় আছি আমরা।’
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বিগত কমিশনের সময় ক্রয়কৃত ইভিএম যন্ত্রগুলো দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় এগুলো সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তারপরও দুদকের মামলা ও নিরীক্ষা আপত্তি থাকায় এগুলো নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না তারা। এসব বিষয়ের নিষ্পত্তি হলে কমিশন বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
- বিষয় :
- ইসি
