ফ্যামিলি কার্ডপ্রাপ্তরা অন্য কোনো ভাতা পাবেন না
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ২১:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। ইতোমধ্যে এ দুটি কার্যক্রম চালু হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই দুটি কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ৮৩ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নতুন বাজেটে দুই খাতে মোট ১৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডপ্রাপ্তরা অন্য কোনো ভাতা পাবেন না।
আগামী অর্থবছরে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সরকারি সম্মানী, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতাও বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ছে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের মাসিক ভাতা কার্যক্রমেও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ফ্যামিলি কার্ডে বাড়ছে উপকারভোগী
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুন পর্যন্ত ৮০ হাজার মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে ৭২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ ব্যয় হবে সরাসরি নগদ সহায়তায় এবং বাকি ৩৪ শতাংশ ব্যয় হবে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন পদ্ধতি চালু ও কার্ড তৈরির কাজে।
আগামী বাজেটে এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৪১ লাখ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। বর্তমানে পরিবারপ্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে যা অপরিবর্তিত থাকবে। বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যারা আগে থেকেই অন্য ভাতা পান, তারা ফ্যামিলি কার্ড নিলে আগের সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ, তারা শুধু ফ্যামিলি কার্ডের ভাতা পাবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় মোট উপকারভোগীর সংখ্যা এক কোটি ৬১ লাখে উন্নীত করা হবে। চলতি অর্থবছরসহ পাঁচ বছরে এ খাতে মোট ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা।
কার্ডের আওতায় আসছে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষক
কৃষি খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনার মতো সুবিধা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে কৃষকদের কার্ডের আওতায় আনার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু করছে সরকার। আগামী জুন পর্যন্ত ২০ হাজার ৬৭০ কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ কার্ডের আওতায় বছরে দেওয়া হবে আড়াই হাজার টাকা। চলতি বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে পাঁচ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৪২ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য আগামী বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এক হাজার ৬২ কোটি টাকা।
খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ছে
খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের মাসিক ভাতা ৩৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা করা হচ্ছে। একইভাবে বীর উত্তমদের ভাতা ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা। বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীকদের ভাতা ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান ভাতার হার অপরিবর্তিত থাকবে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ৩০ হাজার টাকা, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন শ্রেণিতে ২৭ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধারা ২০ হাজার টাকা করে ভাতা পান।
চলতি অর্থবছরে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার জন্য মোট বরাদ্দ ছিল পাঁচ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে তা সামান্য বাড়িয়ে পাঁচ হাজার ২৪২ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতা বাড়বে
মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরতদের সরকারি সহায়তার আওতা বাড়ানো হচ্ছে। চলতি বাজেটে যেখানে উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৭৮৪ জন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৬৬৬ জন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইমাম, পুরোহিত ও বিহার অধ্যক্ষ হিসেবে থাকবেন ৮৬ হাজার ৮৩৩ জন, মুয়াজ্জিন ও সেবাইত হিসেবে ৮৬ হাজার ৮৩৩ জন এবং ৮২ হাজার খাদেমকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে এক হাজার ৮১ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
খাল খনন কর্মসূচিতেও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ২৬ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ রয়েছে। আগামী অর্থবছরে বাড়িয়ে ৩৪ লাখ করা হবে। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে জনবল ও বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৪৩ হাজার ২৪০ জন উপকারভোগীর বিপরীতে বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৮০ হাজার এবং বরাদ্দ সাত কোটি ৩৭ লাখ টাকা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের বরাদ্দ বাড়ছে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের মাসিক ভাতা কার্যক্রমেও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছেন মোট ১৪ হাজার ৬৫৬ জন। এর মধ্যে শহীদ পরিবার ৮৪৪টি, ‘এ’ শ্রেণির গুরুতর আহত এক হাজার ৬০৭ জন, ‘বি’ শ্রেণির আহত এক হাজার ১২১ জন এবং ‘সি’ শ্রেণির আহত ১১ হাজার ৮৪ জন ভাতা পাচ্ছেন। এ খাতে চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২১২ কোটি এক লাখ টাকা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবে মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১৬ হাজার ৫১৩ জন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে শহীদ পরিবার ও ‘এ’ শ্রেণির আহতের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ‘বি’ শ্রেণির আহতের সংখ্যা বাড়িয়ে এক হাজার ৬১৪ জন এবং ‘সি’ শ্রেণির আহতের সংখ্যা বাড়িয়ে ১২ হাজার ৪৪৮ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভাতার হার অপরিবর্তিত থাকবে। সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ায় আগামী অর্থবছরে এ খাতে ২৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় ২৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা বেশি।
- বিষয় :
- ফ্যামিলি কার্ড
- বাজেট
