ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘দল নয়, সাংবাদিকতা, এটাই রাজনৈতিক রিপোর্টারের একমাত্র সুরক্ষা’

বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী

‘দল নয়, সাংবাদিকতা, এটাই রাজনৈতিক রিপোর্টারের একমাত্র সুরক্ষা’
×

বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনে সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী (ছবি-মামুনুর রশীদ)

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ১১:৫৪ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ১৮:০২

রাজনৈতিক বিটে কাজ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাবের মধ্যে পড়ে যান। কেউ বিএনপির নিউজ কাভার করতে গিয়ে বিএনপির মতো চিন্তা করেন, কেউ আওয়ামী লীগ কাভার করতে গিয়ে সেই অবস্থানে চলে যান। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা। শনিবার রাজধানীর র‌্যাডিশন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’ এর দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় এ মন্তব্য করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’ শীর্ষক সেশনের আলোচনায় তিনি বলেন, রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো অনেক সাংবাদিক বিট কাভার করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই সংশ্লিষ্ট দলের সঙ্গে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। অথচ একজন রিপোর্টারের পরিচয় হওয়া উচিত কেবল সাংবাদিক হিসেবে। ‘আমি আওয়ামী লীগ কাভার করতে এসেছি, বিএনপি কাভার করতে এসেছি বা জামায়াত কাভার করতে এসেছি, এটা ভাবলে চলবে না। আমি এসেছি সাংবাদিকতা করতে, এটাই আমার একমাত্র সুরক্ষা,’ বলেন তিনি।

সেকেন্ড প্লেনারি সেশনে ‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’ বিষয়ে আরও বক্তব্য দেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। অধিবেশন সঞ্চালনা করেন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। দু'দিনব্যাপী এই সম্মেলন আয়োজন করে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।

সমকাল সম্পাদক বলেন, শুধু সাংবাদিকদের দায়ী করলেই হবে না; সংবাদমাধ্যমের ভেতরেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক বিটে এমন সাংবাদিকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সফট কর্নার রয়েছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোরও নিজেদের পছন্দের সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করার প্রবণতা আছে। ফলে তথ্যপ্রাপ্তি, যোগাযোগ ও প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও অঘোষিত বাধা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিট মানেই শুধু দলীয় সংবাদ সম্মেলন বা বক্তব্য সংগ্রহ নয়। একজন রাজনৈতিক রিপোর্টারকে সংবিধান, রাষ্ট্রের আইন, দলগুলোর গঠনতন্ত্র এবং শাসনব্যবস্থার কাঠামো সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকতে হবে। কারণ সাংবাদিকতা মূলত অনিয়ম, অপব্যবহার ও জবাবদিহির প্রশ্ন নিয়ে কাজ করে।

তিনি আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমের ভেতরে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে আলাদা শেখার পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। ‘একজন রাজনৈতিক রিপোর্টারকে শুধু একটি দলের খবর জানলেই হবে না- রাষ্ট্র কীভাবে চলে, সংসদ কীভাবে পরিচালিত হয়, আইন কীভাবে কাজ করে, এসবও জানতে হবে তাকে,’ বলেন তিনি।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী কণ্ঠ তুলে ধরার বিষয়টিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন শাহেদ মুহাম্মদ আলী। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা, দলগুলোর অতীত ভূমিকা এবং সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে বিরোধী কণ্ঠ যথাযথভাবে উপস্থাপন করা অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে। এতে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।

শাহেদ মুহাম্মদ আলীর মতে, রাজনৈতিক সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে ভাবার এখনই সময়। শুধু বিটভিত্তিক দায়িত্ব নয়, জ্ঞান, দক্ষতা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও নৈতিক অবস্থান-সব মিলিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ সাংবাদিক তৈরি করাই এখন গণমাধ্যমের বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে ‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’ শীর্ষক সেশন (ছবি-মামুনুর রশিদ)

ব্যবসা ও রাজনীতির ক্রমবর্ধমান যোগসাজশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল করছে: ড. ইফতেখারুজ্জামান
দেশে ব্যবসা ও রাজনীতির ক্রমবর্ধমান যোগসাজশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে সমস্যা নেই। তবে সংকট তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং রাজনীতি নিজেই ব্যবসায়িক বিনিয়োগে পরিণত হয়। তাঁর ভাষায়, ‘রাজনীতি যখন ব্যবসা হয়ে যায় এবং ব্যবসা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত হয়, তখন জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থা এখন পুঁজি, অর্থ, ধর্ম, পিতৃতন্ত্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের মতো শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো গণমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। গণমাধ্যমের মালিকানা, নীতিনির্ধারণ এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘জিরো সাম গেম’ বা ‘সব না হলে কিছুই না’ ধরনের প্রবণতা চালু রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, এই সংস্কৃতির ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে সমালোচনা ও তথ্য প্রকাশকে অনেক সময় হুমকি হিসেবে দেখা হয়। ফলে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হয়। গত দুই দশকে রাষ্ট্রীয় ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও অবস্থান বদলে যাওয়ার প্রবণতা এখন স্পষ্ট বাস্তবতা।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক জানান, তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত ইস্যু হিসেবে দেখেন না। বরং এটি মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বক্তব্যে কঠোর আইন ব্যবহারের সমালোচনাও করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শত শত সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিশোধ ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা বহাল থাকলে প্রকৃত অর্থে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে ‘রিডার্স এডিটর’ নিয়োগের প্রস্তাব কামাল আহমেদের
গণমাধ্যমের জবাবদিহি ও নিজস্ব নীতিমালার ওপর জোর দেন কামাল আহমেদ। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, গত দেড় বছরেও সম্পাদক পরিষদ সাংবাদিকদের জন্য একটি ‘কোড অব এথিকস’ বা আচরণবিধি তৈরি করতে পারেনি। তিনি পাঠকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে একজন ‘রিডার্স এডিটর’ নিয়োগের প্রস্তাব করেন।

সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অবহেলিত মানুষ প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়: জাফর আব্বাস
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সুশাসন ও দুর্নীতির সংকট প্রায় একই রকম। বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা ভারত-সব দেশেই গণমাধ্যম একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস। 

আলোচনায় জাফর আব্বাস জানান, বাংলাদেশের ‘প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’, দুর্নীতির ধারণা সূচক, সুশাসনের পরিস্থিতি নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল যেন পাকিস্তানের কথাই বলা হচ্ছে। সেখানে কোনো ভারতীয় সাংবাদিক থাকলেও হয়তো একই অনুভূতি প্রকাশ করতেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বড় শহরকেন্দ্রিক অপরাধ কিংবা ক্ষমতার লড়াই গণমাধ্যমে বেশি গুরুত্ব পায় মন্তব্য করে বিবিসির সাবেক এই সাংবাদিক বলেন,  কিন্তু সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অবহেলিত মানুষের বিষয়গুলো প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। পাকিস্তানে যেমনটি হচ্ছে, তেমনি ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যায়।

তিনি বলেন, শুধু সরকারের সমালোচনা করলেই হবে না; সমাজের সামগ্রিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের সব স্তরের মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরা এবং নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক চাপ তৈরি করা।

জীবনমান ও উন্নয়ন নিয়ে পশ্চিমা দেশের সঙ্গে তুলনার প্রবণতার সমালোচনা করে জাফর আব্বাস বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাস্তবতা ভিন্ন। সুইডেন, নরওয়ের মতো ছোট জনসংখ্যার দেশের সঙ্গে তুলনা না করে, আগে দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।

গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ মিডিয়া কমিউনিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হতে হবে: জোয়ান বারাটা
আন্তর্জাতিক মিডিয়া আইন বিশেষজ্ঞ জোয়ান বারাটা বলেন, গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ (সেলফ-রেগুলেশন) কোনোভাবেই মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়া উচিত নয়। এটি মিডিয়া কমিউনিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হতে হবে।

দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান 
ডিজিটাল সাংবাদিকতায় দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের টিম লিডার আয়েশা কবীর। তিনি বলেন, আমাদের নীতি হলো— আগে তথ্য যাচাই করো, তারপর প্রকাশ করো। ভুল হলে তা লুকানো নয়, বরং গুরুত্ব দিয়ে ভুল স্বীকার করা উচিত।
 

আরও পড়ুন

×