ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মা দিবসের আয়োজন

সংগ্রাম ও সম্ভাবনায় মা, তাঁর হাতেই স্বপ্নের আলো

সংগ্রাম ও সম্ভাবনায় মা, তাঁর হাতেই স্বপ্নের আলো
×

‘গরবিনী মা-২০২৬’ সম্মাননা প্রদান করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ হোসেন। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:৫৪

মায়ের মুখে প্রথম উচ্চারিত শব্দ থেকেই মানুষের পৃথিবী দেখা শুরু। সেই মায়ের ত্যাগ, নীরব ভালোবাসা, সংগ্রাম আর অদৃশ্য শক্তিকে কেন্দ্র করেই ঢাকায় এবার মা দিবস হয়ে উঠল কৃতজ্ঞতা, স্বীকৃতি ও সম্ভাবনার এক মানবিক উৎসব। একদিকে সন্তানের সাফল্যের পেছনে নীরব প্রেরণা হয়ে থাকা মায়েদের সম্মাননা, অন্যদিকে সংসার সামলে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা নারীদের স্বপ্নযাত্রার উদ্‌যাপন। দুই ভিন্ন আয়োজন যেন একই সুতোয় গাঁথল মাতৃত্বের বহুমাত্রিক মহিমা। স্বীকৃতি, সংগ্রাম ও সম্ভাবনায়– সবখানে মা। তাঁর হাতেই স্বপ্নের আলো।

মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘গরবিনী মা’ সম্মাননা অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠছিলেন একেকজন মা। তাদের সঙ্গে উঠে আসছিল সংগ্রাম, অশ্রু, প্রার্থনা আর অবিচল সাহসের গল্প। ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আয়োজিত এ বছরের ‘গরবিনী মা’ সম্মাননার ছিল ১৩তম আয়োজন।

আলো ঝলমলে মঞ্চে যখন একে একে সম্মাননা তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন করতালির আড়ালে যেন ভেসে উঠছিল অগণিত নিঃশব্দ ত্যাগের প্রতিধ্বনি। প্রশাসন, আইন ও বিচার, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, সংগীত, অভিনয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সন্তানের মায়েদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এই সম্মাননা।

সম্মাননা পাওয়া মায়েদের মধ্যে ছিলেন– রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের মা ফরহাত ইসলাম, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বরিশালের বিচারক মোহা. রকিবুল ইসলামের মা রোকেয়া রশীদ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামের মা রাজিফা আজাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানিয়া হকের মা সেলিমা হক, সাংবাদিক এ কে এম মনজুরুল ইসলামের মা রাজিয়া আহমেদ, চিকিৎসক অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ প্রসাদের মা সরস্বতী প্রসাদ, সংগীতশিল্পী সোমনূর মনির কোনালের মা সায়মা মনির মিনু, অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণের মা সৈয়দা শারমিন এবং অভিনেতা ও নির্মাতা জিয়াউল হক পলাশের মা ফাতেমা আক্তার কাজল।

অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি ছিল জিয়াউল হক পলাশের বক্তব্য। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি মায়ের অসুস্থতা, নিজের ব্যর্থতা এবং সংগ্রামের গল্প বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার সংবাদে তাঁর মা ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন প্যারালাইজড ছিলেন। সেই স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পরিবার পাশে না থাকলেও মায়ের নীরব সাহস তাঁকে টিকে থাকতে শিখিয়েছে।

আরেকটি গল্প ছিল শিক্ষার জন্য এক মায়ের লড়াইয়ের। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক খাইরুল ইসলাম স্মরণ করেন তাঁর মা শিরিন আক্তারকে। বাবার মৃত্যুর পর অর্থসংকট আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও মা শেষ সম্বল বিক্রি করে ছেলেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন। সেই গল্প যেন মঞ্চের বাইরে বসে থাকা বহু মায়ের জীবনকথাকেও প্রতিনিধিত্ব করছিল।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অবাধ তথ্য প্রবাহের এই সময়ে নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করা মায়েদের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে বরং এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী। স্বাগত বক্তব্য দেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী। সঞ্চালনায় ছিলেন সংবাদ পাঠিকা বিপাশা মজুমদার।

অন্যদিকে, একই দিনে রাজধানীর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানে মা দিবস পেয়েছে আরেকটি ভিন্ন মাত্রা। ব্র্যাক ব্যাংক তারার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য মাদারহুড মুভমেন্ট’, যেখানে মাতৃত্বকে দেখা হয়েছে নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা শক্তি ও আত্মমর্যাদার নতুন পরিচয়ে।

দিনব্যাপী আয়োজনে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ কাড়ে ‘মাদার্স মার্কেট’। সেখানে ৩০টি নারী নেতৃত্বাধীন ব্র্যান্ড তাদের হাতে তৈরি গহনা, হস্তশিল্প, ঘরসজ্জা সামগ্রী, ফ্যাশন পণ্য, মোমবাতি, আর্টিসানাল ফুড এবং ঘরে তৈরি সংরক্ষিত খাদ্যপণ্য নিয়ে হাজির হয়। প্রতিটি স্টলে শুধু পণ্য নয়, ছিল একেকটি মায়ের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মনির্ভরতার গল্প।

‘সেলিব্রিটিং প্যাশন, পাওয়ার অ্যান্ড পসিবিলিটি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘ব্যালান্সিং  বিজনেস অ্যান্ড মাদারহুড’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন খাতের সফল নারী পেশাজীবীরা। তারা মাতৃত্ব ও পেশাজীবনের ভারসাম্য, সামাজিক চাপ, মানসিক ক্লান্তি এবং আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দেওয়া হয় ‘ইনস্পায়ারিং মাদার্স অ্যাওয়ার্ডস’। সম্মাননা পান উদ্যোক্তা ফারজানা শেখ সুমি, মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ ফারজানা রহমান বেনু, প্রযুক্তি খাতের সংগঠক সায়মা শওকত এবং আনজুমান আরা শিলা।

আরও পড়ুন

×