ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দশ বছরে নার্স বেড়েছে শতভাগ দক্ষতা ঘাটতি ৮২ ভাগ

দশ বছরে নার্স বেড়েছে শতভাগ দক্ষতা ঘাটতি ৮২ ভাগ
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে এক দশকে নার্স বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট। তবে নার্সের সংখ্যা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি স্বাস্থ্যসেবার মানে। দুর্বল কারিকুলাম, পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের অভাব ও শিক্ষক সংকটে বিশেষ দক্ষতা ছাড়াই কাজ করছেন ৮২ শতাংশ নার্স। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেশাগত অবমূল্যায়নের কারণে নার্সিং খাত এখনও কাঠামোগত সংকটে রয়েছে। এছাড়া নার্সিং গবেষণার পরিধি এখনও সীমিত। গবেষণায় অর্থায়নের অভাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতি এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দক্ষ ও ক্ষমতায়িত নার্স ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউএইচসি) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সম্ভব নয়। এমন বাস্তবতায় আজ মঙ্গলবার বিশ্ব নার্স দিবস পালিত হচ্ছে। এই দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের নার্স, আমাদের ভবিষ্যৎ: ক্ষমতায়িত নার্স জীবন বাঁচায়’। 

বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রায় ১১০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এ সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৮৪। ১০ বছর আগে ছিল ৫৫ হাজার ৫০০ জন। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ৪৭ হাজার ১২৬ জন নার্স। একই সময়ে নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট ৩১৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৫৩টি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে নার্স আছেন মাত্র দশমিক ৬৬ জন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের অনেক নিচে। ডাক্তার-নার্স অনুপাতও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও দক্ষতা বাড়েনি জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব বায়োমেডিকেল অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সের পিএইচডি গবেষক সালমা আখতার বলেন, দেশে নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। আধুনিক সিমুলেশন ল্যাবের অভাব, দক্ষ শিক্ষকের সংকট এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি নার্সিং শিক্ষাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন (সিপিডি) কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে অনেক নার্স তাল মেলাতে পারছেন না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার প্রশিক্ষিত নার্স এবং ৮ হাজার মিডওয়াইফ বেকার রয়েছেন। অথচ অনেক বেসরকারি হাসপাতালে পেশাদার নার্সের পরিবর্তে অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের দিয়ে নার্সিং সেবা পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি এ পরিস্থিতিকে জাতীয় বিপর্যয় বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে কর্মরত নার্সদের নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে পেশাদার নার্স নিশ্চিত করা সহজ হবে।

তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডের আদলে বাংলাদেশেও প্রতি তিন বছর অন্তর পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স নবায়ন বা কন্টিনিউয়াস প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট (সিপিডি) ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে নার্সদের দক্ষতা ও সেবার মান বাড়বে।

নার্স দিবস উপলক্ষে গতকাল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নার্সিং পরিস্থিতি, সংকট, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয়ক প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে নার্সিং গবেষণার পরিধি এখনও সীমিত। গবেষণায় অর্থায়নের অভাব এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে কম প্রকাশনার কারণে প্রমাণভিত্তিক নার্সিং সেবা গড়ে উঠছে না। অন্যদিকে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, টেলি-নার্সিং ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ব্যবহারও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে নার্সদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে নার্সিং পেশাকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হয়। সমাজের একটি অংশ একে শুধু নারীদের পেশা হিসেবে দেখে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নার্স নারী হওয়ায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স ড. মাহবুবা আফরিন বলেন, দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নার্স সংকট সবচেয়ে প্রকট। সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক নার্স গ্রামে কাজ করতে অনাগ্রহী। এ কারণে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে একজন নার্সকে অনেক সময় একাধিক রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। অতিরিক্ত কর্মচাপ, দীর্ঘ সময় কাজ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া এবং সীমিত পেশাগত স্বাধীনতার কারণে নার্সদের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আক্তার বলেন, নার্সিং খাত উন্নয়নে আধুনিক ও দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম চালু, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, সিমুলেশন ল্যাব স্থাপন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত নার্স নিয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, বেতন-প্রণোদনা বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে নার্সদের অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি। পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও টেলিমেডিসিনে নার্সদের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিকমানের নার্সিং সেবা গড়ে তোলা সম্ভব। 

 

আরও পড়ুন

×