ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লেবাননে ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত 

সংসারের অভাব ঘোচাতে গিয়ে প্রাণটাই চলে গেল তাদের 

তীব্র নিন্দা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 

সংসারের অভাব ঘোচাতে গিয়ে প্রাণটাই চলে গেল তাদের 
×

ছবি : রয়টার্স

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৩:১৫

সংসারের অভাব ঘোচাতে গিয়ে প্রাণটাই দিয়ে দিলেন সাতক্ষীরার দুই ব্যক্তি। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ের এলাকায় গত সোমবার দুপুরে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন তারা। নিহতরা হলেন– সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি ইউনিয়নের কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম (২২)।

দুই মাস আগে ঋণের টাকায় ও সরকারি ভিসায় লেবাননে পাড়ি জমান তারা। তাদের মধ্যে আফসার আলী ও আজেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান শফিক এবং আবদুল কাদের ও নুরুন্নাহার খাতুন দম্পতির বড় সন্তান নাহিদ। শফিকের বড় মেয়ে মৌ আক্তার ভালুকা চাঁদপুর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির প্রথম বর্ষের ছাত্রী ও ছোট মেয়ে বৃষ্টি আক্তার বুধহাটা কাওসারিয়া দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। অন্যদিকে, নিহত নাহিদ ২০২৪ সালে এসএসসি পাসের পর নিজ এলাকায় শ্রমিকের কাজ করতেন। 

গতকাল মঙ্গলবার সকালে শফিকের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, স্বজনের বুকভাঙা আর্তনাদ। তাঁর স্ত্রী রুমা খাতুন কাঁদছেন আর বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা আছিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে ১০ লাখ টাকার ঋণ করে গেছে, আমরা এই টাকা এখন কই পামু। এখন ছেলের লাশটা দেশে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’

শফিকুলের বাবা আফসার আলী বলেন, ‘সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে ঋণের টাকায় বিদেশে যায় সে। এখনও কাজকাম ঠিকমতো করে উঠতে পারেনি। অভাব-অনটনের মধ্যে কোনো রকমে চলে সংসার। এখন আমার ছেলে নাই, কই যামু, কী খামু তা ভেবে পাচ্ছি না।’

ছোট মেয়ে বৃষ্টি বলে, গত রোববার শেষ কথা হয় বাবার সঙ্গে, সোমবার সারাদিন আর কথা হয়নি। এরপর টিভির খবরে শুনলাম, লেবাননে ড্রোন পড়ে বাবা আহত হয়েছেন। এরপর সন্ধ্যার পর সেখানে একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। লেবাননে থাকা মামা বিষয়টি আমাদের জানান।

ধুলিহর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, শফিকুলের মৃত্যুতে আমরা খুব ব্যথিত। সরকারের কাছে আবেদন করব, দ্রুত যেন তাঁর লাশটা দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

অন্যদিকে, আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি আর আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদিউজ্জমান খান নিহতের পরিবারের বরাত দিয়ে বলেন, নাহিদুল ইসলাম অভাবের তাড়নায় এসএসসি পাসের পর আর পড়ালেখা করতে পারেনি। তার ছোট ভাই নাফিজ হোসেন আমাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে পাঁচ লাখ টাকার ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় সে। সন্তানকে হারিয়ে শোকে বাবা-মা দিশেহার হয়ে পড়েছেন। তার লাশটা দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, এ ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ যতটা সাহায্য তাদের করতে পারে, তা করা হবে। তাদের লাশ দেশে নিয়ে আসার ব্যাপারে প্রবাসীকল্যাণ কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আমরা আবেদন করেছি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা করবে।

আশাশুনির ইউএনও শ্যামানন্দ কুণ্ডু বলেন, নাহিদুল ইসলামের লাশ আনতে স্থানীয় প্রশাসন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাবে। তাঁর লাশ যাতে দেশে ফিরে আসে, সে জন্য সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।

তীব্র নিন্দা ঢাকার
বাসস জানায়, লেবাননে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি দুই নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানানোর পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করেছে।

লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাস নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া দূতাবাস কর্তৃপক্ষ নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ওই অঞ্চলে চলমান সহিংসতা এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

আরও পড়ুন

×