প্রথম জন্মদিনের আগেই চলে গেল আরাফ
হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু
রাইয়ান আল আরাফ
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাইয়ান আল আরাফের প্রথম জন্মদিন ছিল আগামী ২৫ মে। মা-বাবার ইচ্ছা ছিল, ঘটা করে একমাত্র সন্তানের জন্মদিন উদযাপন করবেন। সে জন্য আত্মীয়স্বজনকে আগেভাগে বলেও রেখেছিলেন। কিন্তু তার আগেই হাম কেড়ে নিয়েছে আরাফের প্রাণ।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ী মধ্যপাড়ার আতিকুল ইসলাম ও রহিমা আক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান সে। হামে আক্রান্ত হয়ে এ জেলায় সাত শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে আরাফ একজন।
আতিকুল ইসলাম জানান, গত ১৪ এপ্রিল
আরাফের জ্বর আসে। রেশ ওঠে শরীরে। ১৭ এপ্রিল তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন, শিশুটি হামে আক্রান্ত। হাম ইউনিটে ভর্তি করানোর পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। আতিকুল ও চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যোগাযোগ করেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন দেওয়ায় ঢাকায় নেওয়া যায়নি। ঢাকায় তিনটি হাসপাতালে যোগাযোগ করে কোনো শয্যার ব্যবস্থা করতে পারেননি আতিকুল। তাই শজিমেকেই চিকিৎসা করানো হচ্ছিল। অবশেষে ২৬ এপ্রিল সেখানে আরাফের মৃত্যু হয়।
আরাফকে হারিয়ে কান্না থামছে না রহিমা আক্তারের। তিনি বলেন, ‘হামের টিকা দিতে গেলে জ্বর থাকায় তা দেননি স্বাস্থ্যকর্মীরা। চার-পাঁচ দিন পরে জ্বর নামলেও আর টিকা দিতে যাওয়া হয়নি। আরও যেসব টিকা দেওয়ার নিয়ম ছিল, তাও ঠিকমতো দেওয়া হয়নি।’
শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর এ মোর্শেদ বলেন, ‘আমাদের এখানে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার আলাদা কোনো পিআইসিইউ বা আইসিইউ ব্যবস্থা নেই। কিন্তু কমতি নেই চিকিৎসার।’
‘আমার ঘরডা অন্ধকার অইয়া গেছে’
‘মাইডারে বুকের মধ্যে লইয়া ঘুমাইতাম। যহনই মনে অয়, মাইয়া আর নাই, আমার কইলজাডা ফাইট্টা যায়! তারে ছাড়া আমার ঘরডা অন্ধকার অইয়া গেছে।’ আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন হেলেনা আক্তার।
গত ৩ মে থেকে এভাবে কাঁদছেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের দত্তগ্রাম এলাকার ইসলাম উদ্দিনের স্ত্রী হেলেনা। এদিন হামে আক্রান্ত হয়ে তাদের সাত মাসের সন্তান তাজনিনের মৃত্যু হয়। এই দম্পতির দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিল সে। এ কারণে আদরও পেত বেশি। তাকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে পরিবারের সবাই।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ইসলাম উদ্দিনের বাড়িতে দেখা যায়, উঠানের এক কোণে কয়েক প্রতিবেশী বসে আছেন। বাড়িজুড়ে নিস্তব্ধতা। ঘরের ভেতরে বিলাপ করছেন হেলেনা আক্তার। ইসলাম উদ্দিনের চোখেমুখে অসহায়ত্ব। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি।
ইসলাম উদ্দিন জানান, গত ঈদুল ফিতরের পরদিন থেকে তাজনিনের জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় তাকে। চার দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে আবার জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। গত ২৮ এপ্রিল আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাঁচ দিন পর ৩ মে রাতে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শিশুটি মারা যায়।
‘সন্তান মৃত্যুর জন্য কাকে দায়ী করব?’
হামে আক্রান্ত হয়ে গত ৯ এপ্রিল মারা যায় আট মাসের তাহসিন খান। সে পাবনা সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন খানের ছেলে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা আমেনা খাতুন শয্যাশায়ী। তাহসিনের বাবা দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘আমাদের সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। সন্তানের মৃত্যুর জন্য আমরা কাকে দায়ী করব?’
পাবনায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশীনাথপুর গ্রামের সাগর আলীর পাঁচ মাসের কন্যা মাসফিয়া। এ ছাড়া ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের চরগড়গড়ি গ্রামের মনিরুলের ছেলে আব্দুর রহমান (১০ মাস), পাবনা সদরের আতাউল্লার ছেলে জোবায়ের (১০ মাস) এবং মালিগাছা গ্রামের ওয়াসিমের ছেলে উমরের (৭ মাস) মৃত্যু হয়েছে।
(বগুড়া ব্যুরো, পাবনা অফিস ও ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ সংবাদদাতার পাঠানো তথ্য)
- বিষয় :
- শিশুর মৃত্যু
