ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘নেশা ও জীবন একসঙ্গে চলতে পারে না’

‘নেশা ও জীবন একসঙ্গে চলতে পারে না’
×

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধুর মাধ্যমে প্রথমে মাদকের সংস্পর্শে আসেন ফরহাদ (প্রকৃত নাম নয়)। মাদকের টাকা জোগাড় করতে ঢাকার ফ্ল্যাট, টাঙ্গাইলের বাড়ি, জমি– এমনকি ব্যবসার লাইসেন্স পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে। এর আগেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা শেষ হয়েছে মাদকের পেছনে। 

মাদক মানুষকে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকিত্বে ঠেলে দেয়, সম্পত্তি, স্বপ্ন এবং জীবন ধ্বংস করে দেয়– যখন তার এমন উপলব্ধি হলো, ততক্ষণে তিনি নিঃস্ব। হতাশায় নিমজ্জিত ৫০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বুঝতে পারেন, মাদকে ডুবে থাকলে বাকি জীবনও ধ্বংস অনিবার্য। এরপর নিজের চেষ্টা, পরিবারের সহায়তা এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিকিৎসায় প্রায় তিন দশকের মাদকের অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোতে আসেন। 

মাদকাসক্তির সময়ে জীবন কতটা তুচ্ছ, একাকিত্ব ও অসংলগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, বর্তমানে যাপিত স্বাভাবিক জীবনের ফারাকটা উপলব্ধি করতে পেরে অনুতপ্ত তিনি। গত ২২ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরায় একটি অফিসে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জীবনের নানা উত্থান-পতনের কথা তুলে ধরেন। ১৯৯৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে কয়েকবার মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিছুদিনের জন্য কয়েকবার সফলও হয়েছিলেন। তবে বারবার ফিরে যেতেন সেই অন্ধকারে।

এই সময়ের মধ্যে বিয়ে করেছেন, দু্ই সন্তানের বাবা হয়েছেন। দেশ-বিদেশে ব্যবসা করেছেন। কখনও মাদককে পুরোপুরি বিদায় জানতে না পারলেও ২০২৫ সালের আগস্টে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। চূড়ান্তভাবে মাদককে বিদায় জানাতে পেরেছেন তিনি।
ঢাকার একটি এলাকায় ভাড়া বাসায় বাস করেন ফরহাদ। তিনি বলেন, ‘আর কখনও মাদকে ফিরব না। হাতে নেব না হেরোইনের পুরিয়া বা ফুয়েল পেপার। এই সিদ্ধান্তে অটল আছি, অটল থাকব বাকি জীবন। নেশা ও জীবন একসঙ্গে চলতে পারে না। মাদক আমার সব শেষ করে দিয়েছে।’ 

৭০০-এর বেশি নম্বর নিয়ে ১৯৯২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। পরে সেই মেধাবী শিক্ষার্থী তিনবার পরীক্ষা দিয়েও এইচএসসি পাস করতে পারেননি। কারণ, কলেজজীবনে প্রবেশের পরপরই মাদকের জগতে পা রেখেছিলেন। যে ছেলে নিয়মিত ধূমপান করতেন না; সেই ছেলে প্রথমে ফেনসিডিল, পরে হেরোইনে আসক্ত হন।
১৯৯২ সালে এসএসসি পাসের পর টাঙ্গাইলের একটি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে ঢাকায় এক কিশোরীর সঙ্গে প্রেমে জড়ান। মেয়েটি ছিল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী। মাস ছয়েকের মাথায় দুই পরিবার বিষয়টি জেনে যায়। বাধা হয়ে দাঁড়ায় তারা। ফরহাদ বিয়ে করতে চান মেয়েটিকে। তবে পরিবারের অমতে তিনি ফরহাদকে বিয়ে করবেন না বলে জানিয়ে দেন। এক পর্যায়ে ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিবারের চাপে তাদের প্রেমের সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ফরহাদ। 

টাঙ্গাইল শহরের যে এলাকায় ফরহাদের বাস ছিল, সেখানকার একটি চায়ের দোকানের পাশে ফেনসিডিল বিক্রি করা হতো। তাঁর এক বন্ধুর বাড়িতে ওই দোকানি ফেনসিডিল মজুত করে রাখতেন। সেখান থেকে এক বোতল ফেনসিডিল তিন বন্ধু ভাগ করে খান। তারপর এক-দুদিন পরপর এক বোতল তারা ভাগ করে খেতেন। ১৯৯৬ সালে এক বোতল একাই খাওয়া শুরু করেন। মায়ের কাছ থেকে নেওয়া হাত খরচের টাকা থেকে ফেনসিডিল কিনতেন। 
টাঙ্গাইল থেকে তেজগাঁওয়ের বাসায় আসা-যাওয়া করলেও অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ফেনসিডিল খেতেন। ১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে তেজগাঁওয়ে ফেনসিডিল না পেয়ে এক বন্ধুর মাধ্যমে হেরোইনের আখড়ায় যান। 
২০০০ সালে তাঁর বাবা গুলশানের একটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাঁকে দেড় মাস ভর্তি রাখেন। সেখান থেকে বেরিয়ে কিছুদিন পর আবার হেরোইন সেবন করেন। পরে ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আরও দুবার পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিলেও তিনি হেরোইন ছাড়তে পারেননি। 

২০০২ সালে তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) ব্যবসা মাঝেমধ্যে দেখাশোনা করতেন ফরহাদ। পরে বাবার নামে এই ব্যবসার লাইসেন্স নিজের নামে নিয়ে নেন। মাদক না ছাড়ায় তাঁর মামা তাঁকে ২০০৫ সালে সৌদি আরবে নিয়ে যান। সেখানে কার্গো ব্যবসা শুরু করেন। বিদেশের মাটিতেও মাদক সেবন করতেন। দু-তিন মাস পরপর দেশে ফিরে হেরোইন খেতেন। ২০১০ সালে ব্যবসা গুটিয়ে দেশে চলে আসেন। এরই মধ্যে বিয়ে করেন। হেরোইন খাওয়ার টাকা না পেয়ে এক পর্যায়ে সিঅ্যান্ডএফের লাইসেন্স বিক্রি করে দেন। পরে একটি চাকরি নিয়ে যা বেতন পেতেন, তার বেশির ভাগই হেরোইনের পেছনে খরচ করতেন। সংসার চলত না ঠিকমতো। তেজগাঁওয়ে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটটি ২০১৫ সালের দিকে বিক্রি করে দেন। টাঙ্গাইলে একটি বাড়ি ছিল, সেটিও বিক্রি করেন। ফরহাদ বলেন, ‘দুই ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। নেশা করতে গিয়ে সব সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছি। এখন নিঃস্ব। স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে ২০২৫ সালের আগস্টে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে উৎস নামের মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হই। চার মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন ভালো।’ মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যারা এখনও মাদক সেবন করছেন, দ্রুত ফিরে আসেন। এতে জীবন রক্ষা হবে, পরিবার বাঁচবে।’

আরও পড়ুন

×