ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ

সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয় বরং সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব

রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে অধিকারের  প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে গতকাল মঙ্গলবার ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধনের পর ভূমি ভবনের ডে- কেয়ার সেন্টার পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় শিশুদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে তিনি প্রাণোচ্ছল সময় কাটান এবং শিশুদের নিয়ে কেক কাটেন - পিআইডি

 বাসস

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৯:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয়, বরং সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট জনগণ রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, ‘আজ থেকে হয়তো ১০০ বছর আগে যে জমির মালিক ছিলেন মাত্র একজন। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে সেই জমির মালিক হয়তো ১০০ কিংবা তারও বেশি। এভাবে ভূমির মালিকানা-শরিকানা যেমন বেড়েছে, স্বাভাবিকভাবেই জমির মালিকানা-সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে রেকর্ডে রাখার জন্য ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বও তেমন বেড়েছে।’ ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা যায়, জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত বেশি সহজ হয়ে যায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় জমিজমা-সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে। একই সঙ্গে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। চলমান এই ভূমিমেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণকে নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করে জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে সহায়তার লক্ষ্যে সারাদেশে ভূমিসেবা মেলা আয়োজন এবং জমি ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ এবং আধুনিকায়ন করার ব্যাপারে আমরা জাতীয় নির্বাচনের কয়েক বছর আগে প্রণীত ৩১ দফা এবং সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারেও উল্লেখ করেছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) থেকে সারাদেশে তিন দিনব্যাপী এ ধরনের ভূমিসেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেওয়া আরও একটি নির্বাচনী ইশতেহার পূরণ করেছে। সরকার পর্যায়ক্রমে একের পর নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘শুধু জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়েই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। কারণ, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।’

ভূমি নিয়ে বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সারাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সব মিলিয়ে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে জমিজমা-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। সুতরাং, এ মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা এডিআর (বিকল্প বিবাদ নিরসনের ব্যবস্থা), অর্থাৎ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো আইনানুগ মাধ্যম অবলম্বনের দিকে আরও জোর দেওয়া জরুরি। এতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেমন অল্প সময় লাগবে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধ হয়তো শত্রুতায় রূপ নেবে না। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তির কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘শক্তি দিয়ে শান্তি রক্ষা করা যায় না, বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব।’ বিশেষ করে জমিজমা-সংক্রান্ত মামলা বা দেওয়ানি মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে সমঝোতা বা মধ্যস্থতা, সালিশের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথ কার্যকর করা গেলে একদিকে আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমবে, অন্যদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করাও সহজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 
ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এবং ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ উদ্দিন বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, আইন ও বিচারমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংসদ সদস্য ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শিশুদের সঙ্গে প্রাণোচ্ছল সময় কাটালেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুদের সঙ্গে প্রাণোচ্ছল সময় কাটালেন। গতকাল বেলা সোয়া ১১টায় ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ডে-কেয়ার সেন্টার পরিদর্শনে যান। এই সেন্টারজুড়ে তখন শিশুদের খেলনার টুংটাং শব্দ, কোথাও কচি কণ্ঠের হাসি আর আনন্দময় চিৎকার। এমন প্রাণচঞ্চল মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী। নিরাপত্তার কড়া দেয়াল ভেঙে তিনি ১৮ মিনিট সময় কাটান শিশুদের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে শিশুরা আনন্দে মেতে ওঠে। মুহূর্তেই তাঁকে ঘিরে ধরে ছোট্ট শিশুরা। কেউ হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে, কেউ টেনে নিয়ে যায় খেলনার কাছে। কেউ কেউ হাতে আঁকা ছবি দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীও মন দিয়ে সেসব দেখেন, মুগ্ধ হাসিতে প্রশংসা করেন। কখনও আলতো করে হাত বুলিয়ে দেন শিশুদের মাথায়, কখনও তাদের কথায় হেসে ওঠেন প্রাণ খুলে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ঘিরে থাকা ছোট্ট শিশুদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন। শিশুদের বিভিন্ন রকমের চকলেট, টফি, ললিপপ নিজ হাতে দিয়েছেন, দিয়েছেন গিফট ব্যাগও। চকলেট-টফি দিতে দিতে শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর কেউ কি বাকি আছে? পেয়েছো তোমরা সবাই?
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আজকে কার জন্মদিন বলো তো? একেকজনকে বলতে শোনা যায়, আঙ্কেল আমার, আঙ্কেল আমার।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে তোমাদের সবার জন্মদিন। আসো আমরা একসঙ্গে কেক কাটি।’ শিশুদের নিয়ে হাতে হাত রেখে কেক কাটেন সরকারপ্রধান। এ সময় করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো কক্ষ। ‘শিশুরা আনন্দে বলছিল– হ্যাপি হ্যাপি, হ্যাপি ডে, হ্যাপি বার্থ ডে।’ এর মধ্যে এক শিশু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মুখে তুলে কেক খাইয়ে দেয়।

গুলশান লেকের উন্নয়ন নিয়ে বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই বৈঠক হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে গুলশান লেকের পানিদূষণ রোধ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, সৌন্দর্যবর্ধন এবং লেককেন্দ্রিক নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লেকের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে টেকসই উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। 
বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব আব্দুর রহমান সানি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×