বাজেট
শিক্ষায় বিনিয়োগই উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি
ছবি-সংগৃহীত
মো. ওমর ফারুক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ২২:২৪
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা কেবল কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকারই নয়, বরং একটি দেশের আত্মপরিচয় গঠন, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক গতিশীলতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং নৈতিক ভিত্তি রচনার প্রধান চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে একটি চিরন্তন সত্য স্বীকৃত যে, কোনো জাতি যদি দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, তবে তাকে মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করতে হবে। আর এই বিনিয়োগের প্রধানতম ও দৃশ্যমান মাধ্যম হলো রাষ্ট্রীয় শিক্ষা বাজেট। বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার যোগ-বিয়োগ বা আর্থিক খতিয়ান নয়; এটি হলো একটি দেশের সরকারের দূরদর্শিতা, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দলিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও আজ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ, গুণগত মানসম্পন্ন ও সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই ব্যর্থতা আমাদের বারবার ভাবায়—আমরা কি সত্যিই জাতি হিসেবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে চাই, নাকি এর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর সামনে নীরব থেকেই সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের প্রকৃত গুণগত এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হয় নব্বইয়ের দশকে, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রতিষ্ঠার পর। একটি ভঙ্গুর ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্রকে কীভাবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা যায়, তার একটি বাস্তবসম্মত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়েছিল সেই সময়ে। শিক্ষা বাজেটকে কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে না দেখে, একে গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে শিক্ষা বাজেটের আন্তর্জাতিক মানপূরণের প্রশ্নে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি, তা বুঝতে হলে বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর সুপারিশ জানা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা বাজেট হওয়া উচিত তার মোট জিডিপির কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এবং আফ্রিকার অগ্রগামী রাষ্ট্রগুলোতে এই হার প্রায়শই জিডিপির ৫ থেকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি হয়। আমাদের প্রতিবেশী ভারত তার শিক্ষা বাজেটে জিডিপির প্রায় ৪.৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখলেও বাস্তব প্রয়োজনের নিরিখে তা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। শ্রীলঙ্কা প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশ বিনিয়োগ করলেও তার দক্ষতা ও প্রয়োগ অনেক বেশি কার্যকর। ফিনল্যান্ড বা নরওয়ের মতো উন্নত বিশ্বে এই বরাদ্দ ৬ থেকে ৭ শতাংশেরও বেশি।
অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খেয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে—এমনকি আফগানিস্তান বা নেপালের চেয়েও কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১১.৭ শতাংশ এবং জিডিপির মাত্র ১.৭ শতাংশের কাছাকাছি। এই কৃচ্ছ্রসাধন ও অবহেলার কারণে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং মাথাপিছু শিক্ষা ব্যয়ে আমরা প্রতিবেশিদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছি। এই বৈষম্য দূর না করলে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা অসম্ভব।
বিগত ফ্যাসিবাদের সরকারের পতনের পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে এবং যার হাল ধরেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, তাঁর ওপর দেশের মানুষ এক নতুন স্বপ্ন দেখছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি এ দেশের তরুণ সমাজের মাঝে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। তিনি বরাবরই গতানুগতিক ও তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে বাস্তবমুখী, কারিগরি ও মেধাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছেন, যা আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। শিক্ষাব্যবস্থাকে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি দক্ষ, নৈতিকতাসম্পন্ন ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের জনশক্তি গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। তাঁর এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও শিক্ষাবান্ধব নেতৃত্বই পারে বিগত দেড় দশকের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে একটি নতুন জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে। বর্তমান সরকারের প্রধান কাজই হলো রাষ্ট্রকে একটি সঠিক ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর ফিরিয়ে আনা। তাই বর্তমান সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে কিছু সুনির্দিষ্ট রূপকল্প বাস্তবায়ন করা জরুরি।
প্রথমত, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও অন্যান্য অনুদ্বায়ী বা অনুৎপাদনশীল খাতের বাজেট কাটছাঁট করে শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে জিডিপির কমপক্ষে ৩.৫ শতাংশ বা এক লাখ কোটি টাকা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে পাঁচ বছরের একটি সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাজেটের সিংহভাগ অর্থ যেন আমলাতান্ত্রিক কাজে বা কেবল ভবন নির্মাণে ব্যয় না হয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, গবেষণাগার উন্নয়ন, ডিজিটাল লাইব্রেরি স্থাপন এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে শেখ হাসিনা সরকারের চাপিয়ে দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ ও পরীক্ষা-বিমুখ কারিকুলাম অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিল করা প্রয়োজন। দেশের প্রথম সারির শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম কমিটি গঠন করতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রম হতে হবে এমন, যা একদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি করবে, এবং অন্যদিকে আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও জাতীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাবে। প্রাথমিক স্তর থেকেই গণিত, বিজ্ঞান এবং ভাষা শিক্ষার ওপর সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির মতো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের লবিং, ঘুষ বা রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া কেবল মেধার ভিত্তিতে শিক্ষকেরা নিয়োগ পান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র এবং আকর্ষণীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করতে হবে এবং শিক্ষকদের বেতন প্রতি বছর অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে ক্লাসরুমে সেরাটা দিতে পারেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কমপক্ষে ১:৩০, মাধ্যমিকে ১:৩৫ এবং কলেজে ১:৪০ করতে হবে। উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষা বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতের জন্য বাজেটের ৫-১০ শতাংশ বরাদ্দ রেখে একটি বিশেষ বড় তহবিল গঠন করতে হবে। শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রধান শর্ত হতে হবে আন্তর্জাতিক জার্নালে তাদের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্ববাজারের চাহিদার সাথে মিল রেখে তাদের পাঠ্যসূচি পরিমার্জন করতে হবে এবং প্রতিটি বিভাগে ক্যারিয়ার ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাস করার পর বেকার না থেকে সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে অথবা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বর্তমানে প্রতি বছর মাত্র তিন লাখের কাছাকাছি শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা থেকে বের হচ্ছে, এই সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সব উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এআই ভিত্তিক শিক্ষার নতুন পদ্ধতি চালু করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় তদারকি করার জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী অডিট সেল গঠন করতে হবে। শিক্ষা বাজেটের টাকা কোন স্কুল বা কলেজে কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা একটি কেন্দ্রীয় ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। অপ্রয়োজনীয় গাড়ি কেনা, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বা সেমিনারের নামে বাজেটের অর্থ অপচয় সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভর্তি ও নিয়োগে উৎকোচ বন্ধ করতে একটি স্বচ্ছ ও নাগরিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির আইনি ও নৈতিক কঠোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বিগত দেড় দশকে আমরা যে দুঃসহ অন্ধকারের মধ্য দিয়ে গেছি, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আলোর দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার আমলের নারী শিক্ষার জোয়ার এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার যে ইতিবাচক চেতনা, তাকে আমাদের ধারণ করতে হবে। একই সাথে শেখ হাসিনার আমলের চরম দলীয়করণ, প্রশ্ন ফাঁসের সংস্কৃতি, মেধার অবমূল্যায়ন এবং ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রমের যে নেতিবাচক উত্তরাধিকার, তাকে চিরতরে কবর দিতে হবে। বর্তমান সরকারের ওপর তরুণ প্রজন্ম যে বিশ্বাস রেখেছে, তার মর্যাদা দেওয়ার সময় এখনই। একটি বৈপ্লবিক, যুগোপযোগী এবং সাহসী শিক্ষা বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমেই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রকৃত কাজ শুরু হতে পারে। আমরা আর কোনো প্রশ্ন ফাঁসের কলঙ্ক দেখতে চাই না, আমরা চাই না আমাদের সন্তানরা একটি পরীক্ষা-হীন ও জ্ঞান-হীন শিক্ষাক্রমের শিকার হোক। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী ও তারুণ্যবান্ধব নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা লাভ করবে, যা তরুণদের কেবল চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং বিশ্বজয়ী মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলবে—এই আমাদের প্রত্যাশা। একটি মেধাভিত্তিক, ন্যায়পরায়ণ এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই ঐতিহাসিক সুযোগ আমরা কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে পারি না।
মোঃ ওমর ফারুক: প্রভাষক, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
[email protected]
