ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এনসিপির আলোচনা সভা

বাজেটে কর সংস্কার, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দেওয়ার আহ্বান

সরকারের মধ্যে নতুন এস আলম হওয়ার প্রতিযোগিতা হচ্ছে: নাহিদ

বাজেটে কর সংস্কার, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দেওয়ার আহ্বান
×

ছবি: সমকাল

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০২:১৩

জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বর্তমান সরকারের মধ্যে নতুন করে এস আলম এবং সালমান এফ রহমান হওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 

এর আগে তিনটি সেশনে শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা মতামত ব্যক্ত করেন। এতে বক্তারা আসন্ন বাজেটে কর সংস্কার, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

বক্তারা বলেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটকে জনগণমুখী করতে কর ব্যবস্থার সংস্কার, শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও সেবার কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। তারা বলেছেন, বাজেট যেন লুটপাটকারীদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার না হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, জবাবদিহিতা ও বৈষম্যহীন উন্নয়নের ভিত্তি হয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে বিগত ১৬ বছরে নজিরবিহীন লুটপাট এবং দুর্নীতি হয়েছে। কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও পরিবারকেই বিশাল বিশাল অংকের ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং সেই ঋণের টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে, তারা ঋণখেলাপী হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের সাধারণ প্রত্যাশা যে, এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে আর হবে না। কিন্তু সরকারের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যে, সরকারের এস আলম কে হবে, এই সরকারের সালমান এফ রহমান কে হবে, এটার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। 

নাহিদ বলেন, সরকারের লোকেরা আগে বলেছে, নির্বাচিত সরকার এলেই বিদেশি বিনিয়োগ হু হু করে আসা শুরু করবে কিন্তু আমরা দেখলাম, ড. ইউনূস যতটুকু সক্ষমতা দেখিয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সম্পর্ক স্থাপন এবং বাংলাদেশে টাকা আনার ক্ষেত্রে, এই সরকার কিন্তু কোনো একটা দেশ থেকে এখন পর্যন্ত দাওয়াত পর্যন্ত পায়নি। আইএমএফের ঋণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

নাহিদ বলেন, সরকার আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। আমাদের এই আলোচনা সরকার কতটুকু গুরুত্ব সহকারে নেবে, যেখানে সংসদে বিরোধী দলের অনেক আলোচনা পাশ কাটিয়ে সরকার তার মত করে আইন পাশ করেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের এটাই। তারপরও আমরা ছায়াবাজেট করতে চাচ্ছি। 

তিনি বলেন, আমরা একটি সংস্কারমুখী, যেটা বিনিয়োগমুখী এবং যেটা কর্মসংস্থানমুখী বাজেট চাই। সরকার বর্তমান দেশের অর্থনীতি, সরকার সেটা খুব ভালোভাবে ফেস করতে পারত, যদি তারা ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য বজায় রাখত। অর্থনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কারের সাথে অত্যন্ত সম্পর্কিত। আমরা দেখলাম, প্রথম অধিবেশনে সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটে যে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো, সেগুলো রক্ষা করেনি। ফলে আমাদের যে অর্থনৈতিক সংস্কারের যাত্রা ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে আমরা আমরা আবার দুই ধাপ পিছিয়ে গেলাম।

অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, অতীতে বাজেট জনগণের চেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে। এবার এমন বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সাবেক অর্থসচিব ও সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, বাজেটের আকার নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এর অর্থায়ন কাঠামো বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার স্থানীয় বাজার থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। তিনি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ডিজিটালাইজড করা এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূত বা অবসায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে কার্যকর করার প্রস্তাব দেন।

সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা বাড়াতে ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ, এনবিআর সংস্কার এবং এনআইডি-ভিত্তিক সমন্বিত ডিজিটাল কর ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।

‘শিক্ষা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান’ শীর্ষক সেশনে বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর বলেন, সামগ্রিক বেকারত্ব কম হলেও শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বড় সংকট। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও দক্ষতা ও সুযোগের অভাবে অনেকে দীর্ঘ সময় চাকরি পাচ্ছেন না। তাই নীতিনির্ধারণে বাস্তব শ্রমবাজার ও তরুণদের চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেটি তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় ব্যয় করতে হবে। ‘এক শিক্ষক-এক ট্যাব’ বা অবকাঠামোভিত্তিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা, শিখন ঘাটতি পূরণ, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বেশি জরুরি।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা মালিক সমিতির সভাপতি আলী জামান বলেন, নতুন করদাতা সৃষ্টি না করে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাজেটকে দীর্ঘমেয়াদি ও ভিশনারি পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

‘স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা’ শীর্ষক সেশনে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনো চাহিদার তুলনায় কম। একই সঙ্গে জনগণের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার বলেন, বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের উচ্চ হার রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে না পারলে বাজেটের প্রতি আস্থা আরও কমবে।

আলোচনায় আরো অংশ নেন ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান সংসদসদস্য ড. আতিক মুজাহিদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম সদস্যসচিব সংসদসদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন, যুগ্ম সদস্য সচিব নুসরাত তাবাসসুম ও আলাউদ্দিন মোহাম্মদ। ছায়া বাজেট কমিটির উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। 

আরও পড়ুন

×