ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফল

আম সংস্কৃতি, আম বাণিজ্য এবং ভোক্তার দুর্দশা

আম সংস্কৃতি, আম বাণিজ্য  এবং ভোক্তার দুর্দশা
×

রাজশাহীর শ্রীরামপুরসংলগ্ন আমবাগান থেকে সম্প্রতি তোলা -সমকাল

মাহবুব সিদ্দিকী

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য সচেতনতার দিক থেকে আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। খাদ্য নিয়ে আমাদের ভাবনার জগতে রসনাবিলাসের চেয়ে আতঙ্ক বেশি। 

ফল খাওয়া এ দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের অংশ। শুধু স্বাস্থ্যগত বিবেচনা নয়, মৌসুমি ফল খাওয়া আমাদের জন্য ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী হাজার বছরের লালিত স্বতঃস্ফূর্ত আবেগকে আতঙ্কগ্রস্ত করছে। 

বাংলাদেশের প্রধান ফল কাঁঠাল। সবচেয়ে জনপ্রিয় আম। আছে কলা, লিচু, আনারস, পেঁপে, কুল, পেয়ারা, জাম, আমড়া, আতা, মাল্টা, কমলা, বেল, তরমুজ, তাল, জাম্বুরা ইত্যাদি। ইদানীং যোগ হয়েছে স্ট্রবেরি ও ড্রাগন– দুটোই বিদেশি, কিন্তু দেশে উৎপাদন হচ্ছে প্রচুর। 

আমাদের একান্ত নিজস্ব ফল হিসেবে দেশের প্রায় সর্বত্র উৎপাদিত হচ্ছে আম, কাঁঠাল, কলা, আনারস, পেঁপে, লিচু। পরিতাপের বিষয়, কিছু ব্যবসায়ী বিশেষ করে আম, কলা, পেঁপে ও আনারসে সবচেয়ে বেশি বিষ মাখিয়ে বাজারজাত করছেন।

আমের মৌসুম মে মাস থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ায়। তবে কাটিমন নামে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি জাত এক যুগ ধরে দেশে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। খুব উন্নত নয়, তবে বারোমাসি জাত। আম মৌসুমের পাঁচ মাসের মধ্যে জুন ও জুলাই বাজার রমরমা থাকে। 

এই সময়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারে আসছে প্রায় ২৫ জাতের আম। এর মধ্যে অতি উন্নত জাতের আম রয়েছে মাত্র ১০-১২টি। স্থানভেদে বাণিজ্য-সফল আম রয়েছে ১৫ থেকে ২০ জাতের। সর্বাধিক বাণিজ্য সফল আম মাত্র ১২টি। এগুলো হলো–গোপালভোগ, রানীপছন্দ, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, হিমসাগর, বারি আম-৪, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙা, ফজলি, আশ্বিনা, গৌরমতী এবং বারি আম-২ বা লক্ষ্মণভোগ। সূর্যপুরি এবং নাকফজলি নামের দুটি উন্নত জাত রয়েছে যেগুলো বাণিজ্য-সফল। তবে এগুলো অঞ্চলভিত্তিক। সূর্যপুরী ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে এবং নাকফজলি নওগাঁ অঞ্চলে উৎপাদিত হয়।
মুশকিলের বিষয় হলো, মানুষ ভালো জাতের আম কিনতে বাজারে যান, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই জানছেন না, কোন আমটি কখন কিনতে হবে। ভোক্তাদের বিরাট অংশ মাত্র ২ থেকে ৩ জাতের আম ভালোভাবে চিনতে সক্ষম। যেমন ফজলি, ল্যাংড়া এবং আশ্বিনা। এর মধ্যে অনেকেই ফজলি ও আশ্বিনাকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হিমশিম খেয়ে বসেন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আম্রপালি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই জাতটি সহজে চেনা যায়।

দেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে সবচেয়ে পচনশীল আম। এরপর কলা, আনারস এবং পেঁপে। কিন্তু কিছু অসাধু ফল ব্যবসায়ী এই চারটি অধিক পচনশীল ফল পরিপূর্ণ পোক্ত হতে না দিয়ে আগাম গাছ থেকে নামিয়ে বা গাছে থাকতেই বিষ জাতীয় কেমিক্যাল ছিটিয়ে দিচ্ছেন। এতে ফলে রং ধরছে এবং পচন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক দিন বেশি প্রলম্বিত হচ্ছে।

আমের ক্ষেত্রে যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। আম ব্যবসায়ীরা প্রথমত হরমোন প্রয়োগ করছেন আম গাছে, যেন আম আগাম পরিপক্ব হয়। আম পাকানোর দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, অপরিপক্ব আম গাছ থেকে নামিয়ে কার্বাইড জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা। এতে সহজে আমে রং ধরে এবং পাকতে শুরু করে। 

প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব আমে ফরমালিন মিশিয়ে আপেল কিংবা আঙ্গুরের মতো এতো অধিক সময় রাখা সম্ভব নয়। ফরমালিন মাখানো পোক্ত আমের স্থায়িত্বকাল কিন্তু ৫ থেকে ৬ দিনের বেশি নয়। এর পরেই পচন ক্রিয়া শুরু হয়। 

তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা অপরিপক্ব আমকে বেছে নিয়েছেন। এরা গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, হিমসাগর, ল্যাংড়া অপরিপক্ব অবস্থায় গাছ থেকে নামাচ্ছে। এরপর বস্তার ওপর কিংবা খড়ের ওপর বিছিয়ে তাতে কার্বাইড বা ওই জাতীয় বিষ প্রয়োগ করছে। এতে আম অন্তত ৮ থেকে ১০ দিন সরক্ষণ করা যাচ্ছে। এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয় অতিরিক্ত মুনাফার জন্য। 

প্রতারণার এই ফাঁদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে যদি গ্রাহক একটু সচেতন হন। এক্ষেত্রে প্রথম কাজটি হবে সঠিক আমটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। যে আমগুলো আমরা বেশি বেশি কিনে থাকি বা পছন্দ করি তার মধ্যে রয়েছে গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, বারি আম-৪, আম্রপালি, লক্ষণভোগ, রানীপছন্দ, হাঁড়িভাঙা, আশ্বিনা, গৌরমতি ইত্যাদি। এরপরের কাজটি হবে উল্লিখিত আমগুলো কেনার সময়পঞ্জি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা। অর্থাৎ সেগুলো মৌসুমের কোন মাসে এবং সম্ভাব্য কোন তারিখের মধ্যে পরিপক্বতা পায় তা জানা। 

আম এমন একটি ফল; যা অতিমাত্রায় শৃঙ্খলা মেনে চলে। প্রতিটি জাতের আম নিজ নিজ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিপক্বতা পেয়ে থাকে। বাংলাদেশে স্থানভেদে কিছু জাতের ক্ষেত্রে পরিপক্বতা পেতে সময়ের সামান্য আগ-পিছু হচ্ছে। যেমন বান্দরবান এলাকার আম্রপালি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আম্রপালির তুলনায় ১০ দিন আগে পরিপক্বতা পেয়ে চট্টগ্রামের বাজার দখল করে নেয়। সাতক্ষীরায় উৎপাদিত গোপালভোগ এবং ল্যাংড়া রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত গোপালভোগ-ল্যাংড়ার চেয়ে অন্তত পাঁচ থেকে সাত দিন আগে পরিপক্বতা পায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত বারি আম-৪ রাজশাহী অঞ্চলে উৎপাদিত বারি আম-৪ এর সাত থেকে দশ দিন আগে পরিপক্ব হয়। এই উদাহরণগুলোর সঙ্গে সার্বিকভাবে আমের শৃঙ্খলার বিষয়টিকে যুক্ত করা যাবে না।

ভোক্তাকে শুধু জেনে নিতে হবে তাঁর পছন্দের আমটি মৌসুমের কোন মাসে এবং কোন তারিখের মধ্যে পরিপক্বতা পাচ্ছে। এখানে জনপ্রিয় আম কেনার সঠিক সময় (ক্যালেন্ডার) তুলে ধরেছি। আশা করি, আমভক্ত মানুষেরা এই সময়পঞ্জি অনুসরণ করবেন এবং প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাবেন। 

মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন জেলায় (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা ইত্যাদি) সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া আম নামানোর যে সময়সূচি সেটি মূলত আম ব্যবসায়ীদের মনে রাখা। এই সময়সূচি অনুযায়ী ভোক্তারা আম কিনলে হতাশ হতে পারেন। 
সরকারি সময়সূচি মতে সাতক্ষীরা জেলায় গোপালভোগ নামানোর সময় মে মাসের ১২ তারিখ। রাজশাহী জেলায় মে মাসের ২০ তারিখ। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, সাতক্ষীরা জেলায় উৎপাদিত গোপালভোগ আম মে মাসের ১৮ তারিখেও টকভাব রয়ে যাবে। আর রাজশাহী জেলার গোপালভোগ মে মাসের ২৫ তারিখের আগে ক্রয় করলে নিশ্চিতভাবে ঠকতে হবে। কারণ তখন পর্যন্ত গোপালভোগে পরিপূর্ণ মিষ্টতা আসবে না–প্রায় ৩০ শতাংশ টকভাব থেকে যাবে। 
বাণিজ্যিকভাবে সফল ১৬ জাতের আম কখন খাবেন:
আমের নাম        কেনার সময়        জেলার নাম
১.    গোবিন্দভোগ    ১২ মে থেকে ৩০ মে     সাতক্ষীরা
২.    গোপালভোগ  ২০ মে থেকে ১০ জুন  সাতক্ষীরা 
খ)     গোপালভোগ     ২৬ মে থেকে ১৫ জুন     রাজশাহী/চাঁপাইনবাবগঞ্জ
৩.    রানীপছন্দ    ১ থেকে ২০ জুন    
৪.    ক্ষীরশাপাতি    ৮ থেকে ৩০ জুন    
৫.    হিমসাগর    ১০ থেকে ৩০ জুন    
৬.    বারি আম-২ (লক্ষণভোগ)    ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই    
৭.    বোম্বাই    ১২ জুন থেকে ৫ জুলাই    
৮.    ল্যাংড়া    ১৫ জুন থেকে ২০ জুলাই 
৯.    আম্রপালি    ২৮ জুন থেকে ২৫ জুলাই    
১০.     হাঁড়িভাঙ্গা    ২০ জুন থেকে ১৫ জুলাই    
১১.    বারি আম-৪     ২০ জুন থেকে ১৫ জুলাই    
১২.    সূর্যপুরী    ১ থেকে ২০ জুলাই    
১৩.    নাক ফজলি    ৮ থেকে ৩০ জুন    
১৪.    ফজলি    ৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট    
১৫.    আশ্বিনা (ঝিনুক)     ৫ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর    
১৬.    গৌরমতি     ১৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর    

আরও পড়ুন

×