ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই: ইসি

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই: ইসি
×

নির্বাচন কমিশন

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ | ১৭:১১ | আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ | ১৭:২০

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে কমিশন। তবে কোথাও পরিস্থিতির অবনতি হলে বা সহিংসতা বাড়লে পরবর্তী ধাপে যৌক্তিকতা বিবেচনায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন পরিচালনা আইন, আচরণবিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিধি সংশোধনের কাজ চলছে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

গত ১৪ মে ইসির আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা আইন ও আচরণবিধি সংশোধনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা মত দেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হয় না। তবে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ও ইসির আইন-বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা সেনা মোতায়েনের পক্ষে নন। তবে কোনো এলাকায় সহিংসতা বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে পরবর্তী ধাপে যৌক্তিকতা দেখিয়ে সেনাবাহিনী ডাকা হতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাঠে সেনাবাহিনী থাকলেও তারা স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করবে। এর আগে গত ১৮ মে এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো মানসম্পন্ন হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অতীতে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তারপরও কমিশন চেষ্টা করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেন কোনো প্রাণহানি না ঘটে। অতীতের মতো এবারও ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বিভিন্ন এলাকায় আলাদাভাবে ভোট গ্রহণ করা যায় এবং সহিংসতা তুলনামূলক কম হয়।

ইসি জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করা হবে। এসব বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা আইন ও আচরণবিধি সংশোধনের বিষয়ে মতামত নেওয়া হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়েও আলোচনা হবে।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগেও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেসব বৈঠক থেকে পাওয়া বিভিন্ন সুপারিশ পরে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণবিধিমালার সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো মানসম্পন্ন হতে হবে। তিনি অতীতের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সহিংসতার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২৩৬ জন এবং ২০২১ সালে ১১৬ জন নিহত হয়েছিলেন। এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এবং সংঘর্ষ ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিইসি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সচেতনতামূলক প্রচারণা, অংশীজনদের সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সহযোগিতা ছাড়া সংঘর্ষমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্ভব নয়।

এদিকে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য অভিন্ন আচরণবিধি প্রণয়নের কাজও শুরু করেছে। বর্তমানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি রয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সমন্বিত বিধিমালা তৈরি করা হবে। আগামী জুনের মধ্যে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোন স্তর থেকে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কমিশন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এ বিষয়ে ইসির ভিন্নমত রয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক পরিষদের নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ। বর্তমান কমিশনের জন্য সেটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই প্রথমে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে কার্যক্রম শুরুর চিন্তা করছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আগে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং আগামী বছরে উপযোগী হবে আরও ৩৪৯টি। এছাড়া বর্তমানে ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সব পৌরসভার মেয়রদের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। পালিয়ে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়া স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

এই অবস্থায় আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনগুলো আগামী বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত চলতে পারে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিধিমালা সংশোধনের কাজ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এরপরই ভোট আয়োজনের দিকে নজর দেবে কমিশন। একই সঙ্গে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×