ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জাতিসংঘ কমিটির সুপারিশ

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছাচ্ছে

আগামী মাসে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অনুমোদনের জন্য উঠবে

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছাচ্ছে
×

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৫২ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর অনুরোধে সমর্থন জানিয়েছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করতে অনুরোধ করেছিল ঢাকা। সিডিপি তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে।

এলডিসি তালিকা থেকে বের হয়ে কোন দেশে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় ঢুকবে, তা পর্যালোচনার পর সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন গঠিত সিডিপি। বাংলাদেশের বিষয়ে সিডিপির সুপারিশ আগামী মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ইকোসকে উঠবে। পরিষদ অনুমোদন করলে তা আগামী সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তোলা হবে। সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

সিডিপির এই ইতিবাচক মূল্যায়ন ও সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি টেকসই, মসৃণ ও সফল এলডিসি থেকে উত্তরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। 

সিডিপির চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন, কমিটির মূল্যায়ন হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানো যথাযথ হবে। তবে বাংলাদেশকে এ সময়ে তার বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গতকাল সমকালকে  বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার যে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তাতে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি সমর্থন দিয়েছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সরকারকে এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে সাধারণ অধিবেশনে এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়। কারণ, অনেক দেশই হয়তো বাংলাদেশের উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকবে না।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর প্রস্তুতিমূলক সময় পাচ্ছে। এর সঙ্গে আরও তিন বছরের রূপান্তরকাল যুক্ত হয়ে মোট ছয় বছর সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, জাপানের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) হয়েছে। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত এফটিএ করা জরুরি। এ বিষয়ে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সিডিপির কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৬ এপ্রিল এক পত্রে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের  ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।

সিডিপি তার মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ সূচকের প্রতিটিতেই নির্ধারিত সীমা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে এবং নিকট ও মধ্য মেয়াদে এ অবস্থান থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। তবে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দেশের উত্তরণ প্রস্তুতি বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।

কমিটি বাংলাদেশ সরকার প্রণীত মসৃণ উত্তোলন কৌশল (এসটিএস) বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং তারা মনে করে, প্রস্তুতি পর্ব বাড়ানো হলে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী বাজার সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সিডিপি একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতি পর্ব এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সহজ শর্তে অর্থায়ন, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার যথোপযুক্ত সম্প্রসারণ, কারিগরি সহায়তা এবং বাণিজ্য আলোচনার সক্ষমতা বৃদ্ধি।

জাতিসংঘের কমিটি বিশেষভাবে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কর আহরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কমিটির মতে, প্রস্তুতি পর্ব বৃদ্ধি কোনোভাবেই সংস্কার কার্যক্রম বিলম্বিত করার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়; বরং এটি সংস্কার ত্বরান্বিত করার একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

মতামত জানতে চাইলে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, সিডিপি একটি কারিগরি কমিটি। তাদের সমর্থন বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। 

তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদে যদি সর্বসম্মতভাবে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক হবে। তবে কোনো কারণে সর্বসম্মতি না এলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কিন্তু কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি আপত্তি জানিয়ে বলে– তারা বাংলাদেশকে অতিরিক্ত তিন বছর এলডিসি-সংক্রান্ত সুবিধা দেবে না, তাহলে সেই আপত্তিও গ্রহণযোগ্য হবে। তাই বাংলাদেশকে এখন থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে, যাতে সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পক্ষে আসে।

ড. রাজ্জাক আরও বলেন, বাংলাদেশ যদি অতিরিক্ত তিন বছর সময় পায়, তাহলে সেই সময়কে অবশ্যই সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে হবে। উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আবার বলতে না হয়– পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট 
এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অগ্রগতি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হয়। এ মূল্যায়নে তিনটি সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়। এগুলো হলো– মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। কোনো দেশ এ তিন সূচকের মধ্যে অন্তত দুটি সূচকে নির্ধারিত মান অর্জন করলে অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হলে সিডিপি এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করে।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসির তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্ত থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। এর ভিত্তিতে ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়– ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। তবে করোনা মহামারির অভিঘাত মোকাবিলা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য দুই বছর সময় বাড়ানো হয়। 

বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সর্বশেষ নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের নভেম্বর। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ উত্তরণ তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, এলডিসি সুবিধা হারালে সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে দেশের রপ্তানি খাতে।

তাদের মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় পাওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে। উৎপাদিত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এর ফলে দেশের রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎসবিধি আরও কঠোর হবে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর।

সর্বশেষ সফল হয় সলোমন দ্বীপপুঞ্জ
এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর আবেদন করে সর্বশেষ সফল হয় সলোমন দ্বীপপুঞ্জ। ২০২৩ সালে দেশটির সরকার গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে অতিরিক্ত সময় চেয়ে সিডিপির কাছে আবেদন করে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেশটিকে আরও তিন বছর সময় দেয় জাতিসংঘ। এর আগে সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং ভূমিকম্পের কারণে নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণ নির্ধারিত সময়ে সম্ভব হয়নি।

 

আরও পড়ুন

×