ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিন বছর নয়, স্বল্প সময় দেওয়ার সুপারিশ জাতিসংঘ কমিটির

তিন বছর নয়, স্বল্প সময় দেওয়ার সুপারিশ জাতিসংঘ কমিটির
×

 জাকির হোসেন 

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৯:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে বের হতে প্রস্তুতির জন্য বাড়তি তিন বছর সময় চেয়ে বাংলাদেশ আবেদন করলেও জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) তাদের সুপারিশে কোনো সময়কালের উল্লেখ করেনি। কমিটি স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করার পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ তিন বছর বাড়তি সময় নাও পেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ থেকে। 

সিডিপি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছে বাংলাদেশের সংকট পর্যালোচনা বিষয়ে যে রিপোর্ট দিয়েছে তাতে বলেছে, তিন বছরের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের বর্ধিত প্রস্তুতিকাল টেকসই উত্তরণের জন্য বেশি উপযোগী হতে পারে। বিশেষ করে এতে বাংলাদেশ দ্রুত এলডিসিভিত্তিক বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে এবং আরও উৎপাদনশীল, বেশি মূল্য সংযোজনভিত্তিক ও উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরের দিকে দ্রুত এগোতে পারবে।

কমিটি বলেছে, বাংলাদেশ  ইতোমধ্যেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সব শর্ত অনেক ব্যবধানে পূরণ করেছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী নিকট ও মধ্যমেয়াদে এসব মানদণ্ডের কোনো একটিতেও বাংলাদেশের নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। তাই এলডিসি তালিকায় বেশি দিন থেকে গেলে উত্তরণের ফলে যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা, সেগুলো পেতেও বেশি সময় লাগবে। 

জানতে চাইলে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সদস্য বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রমী সুযোগ। এই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সরকারকে দ্রুততম সময়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং পরিবীক্ষণযোগ্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জাতিসংঘকে জানানো উচিত। 

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা উচিত। সংস্কারের প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান অগ্রগতি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। 

সরকারের জরুরি বৈঠক
সিডিপি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর সুপারিশের বিষয়টি সরকারকে জানানোর পরদিন গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে  জরুরি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এলডিসি থেকে উত্তরণের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ওই কমিটির প্রধান থাকবেন। বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতা ছিলেন। 

বৈঠক সূত্র জানায়, গত ২৯ এপ্রিল ইউএন-সিডিপির সঙ্গে সরকারের একটি ভার্চুয়াল আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় বাংলাদেশ কিছু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর ভিত্তিতে মোট ২৫টি ক্ষেত্রে কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কর সংস্কার, সুশাসন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, মানব উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, মেধাস্বত্ব নিয়ে ওষুধ খাতের প্রস্তুতি ইত্যাদি। 

গতকালের বৈঠকে এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রণালয়গুলোকে তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর সুনির্দিষ্ট মতামত দিতে বলা হয়েছে। বৈঠকে পরামর্শ এসেছে, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে খুব দ্রুত জাতিসংঘের কাছে সংস্কার বিষয়ে অঙ্গীকারপত্র পাঠানো উচিত। এ ছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সমর্থন পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

সিডিপির রিপোর্টে যা আছে 
সিডিপি বলেছে, বাংলাদেশ বর্তমানে গুরুতর কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন থেকে উদ্ভূত অনিশ্চিত মাত্রার বাড়তি ঝুঁকি; সাম্প্রতিক অতীতের বিভিন্ন অভিঘাতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব; বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দেশের ভেতরে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।

কমিটির অভিমত হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক বাংলাদেশের প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা বাড়ানো উপযুক্ত হবে। তবে শর্ত হলো এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে তার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।

কমিটি বলেছে, প্রস্তুতিমূলক সময়কাল এবং এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী রূপান্তরকাল– উভয় সময়েই বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা উচিত।  এ সহায়তা প্রস্তুতিমূলক সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে মসৃণ উত্তরণ কৌশল (এসটিএস) বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিকে কমিটি স্বাগত জানিয়েছে। 

কমিটি মনে করে, প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা বাড়ানো হলে বর্তমান সংকটের প্রভাব আরও ভালোভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে এবং এসটিএসে এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে, যা শুধু বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ বা ছোটখাটো সংশোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি এলডিসি-পরবর্তী বাজারে প্রবেশাধিকার-সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলোও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার সুযোগ দেবে। 

সিডিপির রিপোর্টে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশের আর্থিক খাত স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কর রাজস্ব বৃদ্ধি ও ব্যয় অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে দ্রুত অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো। 

সিডিপি স্পষ্ট করে বলেছে, সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা বৃদ্ধি কীভাবে আরও টেকসই এলডিসি উত্তরণ এবং মসৃণ রূপান্তরে অবদান রাখবে, তা বোঝা কঠিন। তাই এই সময়সীমা বৃদ্ধি সংস্কার কার্যক্রম স্থগিত রাখার সুযোগ বা সংস্কার বিলম্বিত করার যৌক্তিকতা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়।

আরও পড়ুন

×