বিএনপিকর্মীসহ তিনজনকে হত্যা জামায়াত নেতার বাড়ি ভাঙচুর
কিশোর ইয়াছিন হত্যার বিচারের দাবিতে অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে বিক্ষোভ। গতকাল বুধবার চাঁদপুর শহরের যমুনা রোড এলাকায় সমকাল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজনৈতিক বিরোধে রানা মিয়া নামে এক বিএনপি কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে ময়মনসিংহের চর ঈশ্বরদিয়া এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এই ঘটনায় তাঁর ভাই মোফাজ্জল হোসেন ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।
প্রধান আসামি মফিদুল ইসলাম মাস্টার ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য এবং তাঁর ছেলে ফাহিম হাসান ৩ নম্বর আসামি। ঘটনার পর থেকে পলাতক তারা।
জানা গেছে, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রানা মিয়া ও তাঁর পরিবার স্থানীয় বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। এরপর থেকেই মহানগর জামায়াত নেতা মফিদুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে তাদের বিরোধ চলে আসছে। গত সোমবার বিকেলে মফিদুল মাস্টারের বাড়ির কয়েকজন তরুণ ফুটবল খেলা শেষে রানা মিয়াদের বাড়ির সামনের একটি দোকানে কোমল পানীয় কিনতে আসে। এ সময় স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে কোমল পানীয় খাওয়া নিয়ে দোকানে থাকা তরুণদের কথা কাটাকাটি হয়। জামায়াত নেতার বাড়ির লোকজন এটিকে নির্বাচনের পুরোনো জেদ হিসেবে ধরে নেয় এবং হুমকি দিয়ে চলে যায়। এরই জেরে সোমবার রাতে জামায়াত নেতার পরিবারের লোকজন দলবদ্ধ হয়ে রানা মিয়াদের এলাকায় হামলা করতে যায়। এ সময় জামায়াত নেতা মফিদুল ইসলাম উপস্থিত হয়ে বিষয়টি সাময়িক মীমাংসা করে দেন। কিন্তু গত সোমবারের ঘটনার রেশ ধরে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চর ঈশ্বরদিয়া এলাকায় বাদী মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে মফিদুল ইসলাম মাস্টার ও তাঁর ছেলে ফাহিম হাসানের পুনরায় কথা কাটাকাটি ও মারামারি শুরু হয়।
বড় ভাইকে মারতে দেখে এগিয়ে যান রানা মিয়া। এ সময় মফিদুল ইসলাম মাস্টারের হাতে থাকা শাবল দিয়ে রানার বুকে আঘাত করেন। এতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রানা। পরে তাঁকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
পরিবারের দাবি, রানাকে বাঁচাতে গিয়ে আরও ৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা হলেন- আশাদ, শাহান, মুনসুর আলী, শাকিল ও দিনি মিয়া। তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তাঁর ভাই গিয়েছিলেন ঝগড়া থামাতে। কিন্তু বিনা কারণে তাঁকে হত্যা করেছেন মফিদুল মাস্টার ও তাঁর ছেলে ফাহিম।
এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি বলেন, ‘রানা বিগত নির্বাচনে আমার পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন।’
ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমির কামরুল আহসান এমরুলের ভাষ্য, ঘটনাটি জানতে পেরেছেন তারা। এটি রাজনৈতিক কোনো বিষয় নিয়ে ঘটেনি। এটি সম্পূর্ণ পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত বিরোধের জেরে ঘটেছে। এই বিষয়ে জামায়াত নেতাকর্মীর দোষ পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার সকালে চর ঈশ্বরদিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে রানার লাশ এলাকায় পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ জনতা জামায়াত নেতা মফিদুল মাস্টারের বাড়িসহ অন্তত ৬টি বসতঘরে ভাঙচুর চালিয়েছে। এ সময় একটি খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই খোরশেদ আলম জানান, লাশ নিয়ে আসার পর বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা ভাঙচুর চালায়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হয়েছে। এজাহারনামীয় ৪ আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে আসামিদের পরিচয় জানতে রাজি হননি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে চর ঈশ্বরদিয়ায় গোলাপের মুদির দোকানের সামনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।
কিশোরের লাশ নিয়ে বিক্ষোভ
গাছ থেকে জাম পাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পিটিয়ে এক কিশোরকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। চাঁদপুর শহরের যমুনা রোড এলাকায় গত মঙ্গলবার এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় বিচারের দাবিতে অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসী। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে বিচারের দাবি করেন তারা।
নিহত মো. ইয়াছিন (১৪) যমুনা রোড এলাকার ইলিয়াছ মিয়ার ছেলে। অভিযুক্ত মুসা প্রধানীয়া ঘটনার পর থেকে পলাতক।
স্বজনদের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার সকালে এলাকার একটি গাছ থেকে জাম পাড়া নিয়ে মুসার সঙ্গে এলাকার শাহজাহান মালের ছেলে মেহেদী হাসানের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে মেহেদীকে মারধর শুরু করে মুসা। এ সময় ইয়াছিন এগিয়ে এসে মারধরের কারণ জানতে চাইলে তাঁর মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে মুসা। পরে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।
চাঁদপুর সদর থানার ওসি ফয়েজ আহমেদ জানান, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে থানায় মামলা করতে বলা হয়েছে।
যুবককে কুপিয়ে হত্যা
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পাওনা দুই হাজার টাকা নিয়ে মিলন মিয়া নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে দলপা ইউনিয়নের দলপা দক্ষিণ পাড়া গ্রামে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। অভিযুক্ত ইমন ও তাঁর মা হাবিবাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন গ্রামবাসী।
নিহত মিলন মিয়া দলপা দক্ষিণ পাড়ার আমজদ আলীর ছেলে। তাঁর কাছে প্রতিবেশী ইমন মিয়া দুই হাজার টাকা পেতেন। বুধবার সকালে সেই পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে মিলনকে কুপিয়ে হত্যা করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাগ্বিতণ্ডার সময় হঠাৎ ইমন মিয়ার মা হাবিবাকে মারধর শুরু করেন নিহত মিলনের এক আত্মীয়। এতে ইমন ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিলনের ঘাড়ে একাধিক আঘাত করেন। পরে আহত মিলনকে উদ্ধার করে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। তাঁর মৃত্যুর খবরে উত্তেজনা দেখা দিলে ইমন ও তাঁর মাকে আটক করে পুলিশে দেন গ্রামবাসী।
কেন্দুয়া থানার ওসি মেহেদী মাকসুদ জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইমন ও তাঁর মা হাবিবাকে আটক করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলেই মামলা নেওয়া হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর ও নেত্রকোনার কেন্দুয়া প্রতিনিধি)
- বিষয় :
- হত্যা
