এ দেশের প্রতি ছিল তার গভীর মমতা
প্রণব মুখার্জি, ছবি: ফাইল
ড. মসিউর রহমান
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২০ | ১৫:১৮
প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল। তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ২০০৯ অথবা ২০১০ সালে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় যোগ দিতে ওয়াশিংটন যাওয়ার পথে ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে সংযোগ ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করার সময় প্রায় দু'ঘণ্টার আলাপ। আলাপের শুরু অর্থনীতি বা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে নয়। রেজাউল করিম নামে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের একজন বড় নেতাকে নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল। খুব সম্ভবত ১৯৪৭ সালের আগে তিনি একটা গ্রন্থ লিখেছিলেন, যার বিষয়বস্তু ছিল এমন যে, মুসলমানরা আগে কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন, তারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাতে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত আসেনি। তবে পরবর্তী সময়ে একটা সাম্প্রদায়িক চর্চা দেখা যায়। রেজাউল করিম সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ ছিল। প্রণব মুখার্জি আমাকে রেজাউল করিমের রাজনৈতিক জীবন ও লেখালেখি সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য দেন।
প্রথম সাক্ষাতে প্রণব মুখার্জি খুবই সাধারণ এবং সহজভাবে আলাপ করলেন। সরকারের উচ্চ পদে আছেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন, এমন কোনো লক্ষণ তার আচরণে ছিল না। আমি অর্থনীতি বিষয়ে দুটি প্রসঙ্গ তুললাম। বললাম, বাংলাদেশসহ ভারতের প্রতিবেশী সবাই ছোট রাষ্ট্র এবং জনসংখ্যা তুলনামূলক কম। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে উন্নয়নের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। বিভিন্ন কারণে আমরা বিভিন্ন জায়গায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। আরেকটি বিষয় ছিল, ভারতের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য কীভাবে আরও সহজ করা যায়। আমার পর্যবেক্ষণ ছিল এমন যে, যেসব জায়গায় যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে, সেখানে খুব একটা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রেও বাধা-বিপত্তি রয়েছে। সবচেয়ে বড় দেশ ও অর্থনীতি হিসেবে ভারত এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হয়। প্রণব মুখার্জি এই সম্ভাবনার সঙ্গে একমত পোষণ করলেন। তিনি বললেন, যেসব উদ্যোগ এক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছিল, তার সবগুলো প্রত্যাশিত ফলাফল আনতে পারেনি এবং সব দেশ মিলে সহায়ক নীতি গ্রহণের দরকার রয়েছে। তার প্রতিক্রিয়া ছিল অল্প কথার, তবে দায়িত্বশীল এবং ইতিবাচক।
এরপর প্রণব মুখার্জির সঙ্গে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে। তিনি যত ব্যস্ত থাকুন না কেন, সময় দিতেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন স্নেহশীল প্রকৃতির। বাংলাদেশের প্রতি একটা আলাদা অনুভূতি ছিল তার। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশের একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এদেশের প্রতি তার গভীর মমতা ছিল। বাংলাদেশের জন্য ভারতের লাইন অব ক্রেডিট নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি ইতিবাচক ছিলেন। তার একটা বিষয় আমি খেয়াল করেছি। তিনি কোনো আলোচনায় অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস কিংবা উৎসাহ প্রকাশ করতেন না। তার বক্তব্য থাকত পরিমিত এবং দায়িত্বশীল। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে নানা আলোচনা হয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। একই ভাষা ও সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি তার সহজ আচরণের কারণে এসব আলোচনা ছিল অনেকটাই সামাজিক ধরনের। তার দাপ্তরিক উচ্চ পদ এক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি করেনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবিত অবস্থায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে বন্ধুত্বসুলভ গভীরতা ছিল, তার কন্যা শেখ হাসিনা যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন তখন থেকে আবার সেই সংকল্প নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। আমার মনে হয়েছে, প্রণব মুখার্জি সেই গভীরতা অনুভব করতেন। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর একবার চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তার সঙ্গে দু'দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার পরিধি থাকত বড় এবং শুধু দুই দেশকেন্দ্রিক নয়। অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে অন্য দেশ কীভাবে সুফল পেয়েছে এবং এই অঞ্চল কী করতে পারে- এসব বিষয়ে তার ভাবনা বেশ বিস্তৃত ছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশেষত প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কম পরিবহন ব্যয়ের সুযোগ নিয়ে কীভাবে লাভবান হওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনায় আগ্রহ ছিল তার। উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান এবং ল্যান টিনবারজেনের গবেষণা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। ল্যান টিনবারজেন দেখিয়েছেন যে, নিম্ন পরিবহন ব্যয়ের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রবণতা থাকে। বড় বাজারে প্রবেশ করতে পারলে কোম্পানির ব্যয় কমে এবং নানা ধরনের চাহিদা মেটাতে পণ্যের বহুমুখীকরণ সম্ভব হয়। পল ক্রুগম্যানের মতে, যেসব ছোট দেশ ইতোমধ্যে বড় বাজারে পণ্য রপ্তানি করে তারা প্রতিবেশী বড় দেশ থেকে বেশি সুবিধা পেতে পারে।
২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। এরপর দু'দেশের মধ্যে সব বিষয় সমন্বয় করার জন্য একটা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হয়। আমাদের পক্ষে সমন্বয় করার জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দেন। ভারতের পক্ষে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের তৎকালীন উপদেষ্টা। তখন আমরা দু'তিন মাস পরপর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতাম। সীমান্তের বিভিন্ন সমস্যা তখন সুরাহা হয়ে যায়। ২০১১ সালে যখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আসেন তখন উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে প্রণব মুখার্জি এসব বিষয়ে সব সময় ইতিবাচক ছিলেন।
ইন্দিরা গান্ধী নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় কংগ্রেস যখন বিভক্ত হয় তখন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে প্রণব মুখার্জি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার সময়ে তা অব্যাহত থাকে। তখন দুই দেশের সরকার তুলনামূলক সুবিধার ভিত্তিতে আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগের কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। তবে সেই উদ্যোগ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর থেমে যায়। প্রণব মুখার্জি চাইতেন বাংলাদেশের সঙ্গে সেই নিবিড় সম্পর্ক পুনরায় স্থাপিত হোক, যা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিজয়ের ফলে দু'দেশের নিবিড় সম্পর্কের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
- বিষয় :
- গভীর মমতা
- প্রণব মুখার্জি
- ড. মসিউর রহমান