হাঁড়িভাঙা আমে এবার ১৫০ কোটি টাকা আয়ের আশা
মিঠাপুকুরে বাগানে হাড়িভাঙা আমের পরিপক্বতা যাচাই করছেন কৃষক। ছবি- সমকাল
আলতাফ হোসেন দুলাল, রংপুর ও হাবিবুর রহমান সোনা, মিঠাপুকুর
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৮:১৭ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ০৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাঁড়িভাঙা আম অতি সুস্বাদু। বছর ঘুরে জুন মাস এলেই এই আমের অপেক্ষায় থাকেন দেশের অগণিত মানুষ। হাঁড়িভাঙা বাজারে আসছে আগামী সোমবার। রংপুরের লালমাটিতে জন্ম নেওয়া ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত হাঁড়িভাঙা এখন শুধু মিষ্টি রসালো ফল নয়, রংপুরের অর্থনীতি ও পরিচয়ের প্রতীক। এবার এই আম থেকে ১৫০ কোটি টাকা আয়ের আশা করা হচ্ছে।
২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙা আম সংগ্রহ ও বাজারজাতের সরকারি নির্দেশনা থাকলেও, চলমান উষ্ণ তাপমাত্রার কারণে তা পাঁচ দিন এগিয়ে আগামী সোমবার (১৫ জুন) নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি বিভাগ।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুরে এক হাজার ৯১৫ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আমগাছ রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে দুই হাজার ৩৮২টি। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে আমগাছ আছে ২২৫ হেক্টর জমিতে। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩১ হাজার টন।
কৃষি কর্মকর্তা ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার আমের ফলন ভালো হয়েছে। বাগান থেকে আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি বিভাগের আশা, চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে ১৫০ কোটি টাকারও বেশি আয় করা সম্ভব হবে।
রংপুরের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ওই আমের চাষ হলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জেলার মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলায় চাষ হয় সবচেয়ে বেশি। মিঠাপুকুরে এক হাজার ২৬০ এবং বদরগঞ্জে ৪১৯ হেক্টর জমিতে বাগান রয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাঁড়িভাঙা সব ধরনের মাটিতে হয়। তবে লালমাটিতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়। স্বাদ, সুগন্ধ ও নানা বৈশিষ্ট্যের কারণে বহু আগেই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পরিচিতি পেয়েছে হাঁড়িভাঙা। ২০২৪ সালে জিআই পণ্য স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর খ্যাতি আরও বেড়েছে।
মিঠাপুকুরের টেকানি গ্রামের চাষি সহিদার রহমান জানান, তিনি দুই একর জমিতে আট বছর আগে হাঁড়িভাঙা আমের বাগান করেন। আগে এই জমিতে ধান-আলুর আবাদ করে লাভ পেতেন বছরজুড়ে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। এখন আমের বাগান করে প্রতিবছর লাভ করছেন অন্তত চার লাখ টাকা। ফলন ভালো হওয়ায় এবার আরও বেশি লাভের আশা করছেন তিনি।
মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নে সবচেয়ে বড় আমের বাজার বসে পদাগঞ্জহাটে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এ হাট থেকে আম কেনেন।
ওই হাটের আম ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, ‘দিন যাচ্ছে, দেশে-বিদেশে হাঁড়িভাঙা আমের চাহিদা বাড়ছে। পদাগঞ্জহাটে মৌসুমি এই আমের বাজার ঘিরে ছোট-বড় অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। সৃষ্টি হয়েছে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান।’
হাঁড়িভাঙা আম চাষি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম বাবলু বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা এখন শুধু একটি আম নয়, রংপুরের ব্র্যান্ড। আমটি ১৫ জুন থেকে শুরু করে জুলাই মাসজুড়ে বাজারে পাওয়া যাবে।’
বাণিজ্যিক চাষের অগ্রদূত
হাঁড়িভাঙা আমের বাণিজ্যিক চাষের অগ্রদূত মিঠাপুকুর উপজেলার টেকানি গ্রামের লুৎফর রহমান। ১৯৯০ সালে তিনি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই আমের চাষ শুরু করেন।
তবে জনশ্রুতি আছে, প্রায় ১১৫ বছর আগে সোহরাব কাসারি নামে একজন মৃৎশিল্পীর হাত ধরে মিঠাপুকুরের উচাবালুয়া গ্রামে প্রথম হাঁড়িভাঙা আমের গাছ জন্মায়। অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির তৈরির তৈজষপত্র ফেরি করে বিক্রি করতেন তিনি। এ সময় ভারতের কোনো এক এলাকা থেকে একটি আম নিয়ে এসে খাওয়ার পরে আঁটি বাড়ির পেছনে ছুঁড়ে মারেন। তা গিয়ে পড়ে মাটির একটি ভাঙা হাঁড়িতে। আঁটি থেকে গজায় চারা। ধীরে ধীরে গাছ বড় হয়ে আম ধরে। স্বাদ-গন্ধে অতুলনীয় আম খেয়ে অনেকে সোহরাবের কাছে আমের নাম জানতে চান। তিনি নাম জানতেন না। এক পর্যায়ে ভাঙাহাঁড়িতে জন্ম নেওয়া ওই আমের নাম সোহরাব কাসারি দেন হাঁড়িভাঙা।
বাণিজ্যিক চাষের অগ্রদূত লুৎফর রহমানের বাবা নফেল উদ্দীন সোহরাব কাসারির কাছ থেকে ১৯৫০ সালে ওই আমের একটি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন মিঠাপুকুরের টেকানি গ্রামের টেকানি মসজিদের পাশে। সেই গাছ থেকেই মূলত রংপুরে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত গাছটি সেখানে রয়েছে। তবে সোহরাব কাসারির ফেলে দেওয়া আঁটি থেকে জন্ম নেওয়া মূল গাছটি এখন আর নেই।
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম বলেন, আশা করা যায়, চলতি মৌসুমে শুধু মিঠাপুকুরেই হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হবে ১২০ কোটি টাকার বেশি। গত বছর বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৯০ কোটি টাকার আম।