মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জীবনমান রক্ষা সম্ভব নয়
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের বাজেট মূল্যায়ন
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গতকাল সোমবার বক্তব্য দেন সংগঠনটির আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য -সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৬ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে একটি ‘চিন্তাশীল নীতি কাঠামো’ হিসেবে উল্লেখ করলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, আর্থিক ভিত্তি ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। এ ছাড়া নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বলেছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না হলে অসুবিধাগ্রস্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমানও রক্ষা করা যাবে না।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মূল্যায়নধর্মী প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজেটে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি একটি সংবেদনশীলতার প্রতিফলন রয়েছে। তাদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী তিন ধরনের চাপে রয়েছে। এগুলো হলো মূল্যস্ফীতি, মজুরি এবং সঞ্চয় হারানোর চাপ। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে অনেক মানুষ তাদের সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে।
ড. দেবপ্রিয়ের মতে, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বা বাণিজ্যের সূচক বাড়লেই সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয় না। বাজেটের কার্যকারিতা নির্ভর করবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মজুরি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের সঞ্চয় সুরক্ষার ওপর। তাই বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রকেও বাজেট মূল্যায়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য তথ্যের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর প্রস্তাব, অর্থমন্ত্রী প্রতি তিন মাস অন্তর জাতীয় সংসদে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন, যাতে নিয়মিত পর্যালোচনা ও নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্যউপাত্তের ক্ষেত্রে অপূর্ণতা, অমনোযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘ছলচাতুরী’ করা হয়েছে। আগের সরকারের মতো যদি বর্তমান সরকারও প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে দেখানো, মূল্যস্ফীতি কম দেখানো বা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত হতাশাজনক।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ১১ শতাংশে উন্নীত হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তিনি বলেন, এখনও এমন কিছু কর্মসূচি এ খাতের আওতায় রয়েছে, যা প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেগুলো পৃথক করে প্রকৃত সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৬০ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাড়তি বরাদ্দ ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে শিক্ষায় ৫৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যে ৬৬ শতাংশ ‘থোক বরাদ্দ’ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বলা হলেও বাজেট নথি অনুযায়ী প্রকৃত হার ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তবে শিক্ষা খাতকে আলাদা খাত হিসেবে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়াকে তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। স্কুলগুলোর পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থার দুরবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক নামি স্কুলেও ওয়াশ সুবিধার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও হাইজিন ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকায় নারী শিক্ষার প্রসারে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে সরকার দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভর্তুকির প্রয়োজনই হতো না। তিনি প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডারে অন্তত ২০০ টাকা ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং এলপিজির ওপর ভ্যাট আরোপের সমালোচনা করেন।
রিজওয়ান রাহমান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের চাকরি দিলে কর ছাড় দেওয়ার পরিবর্তে নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন। তিনি সরকারের উচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।